আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক জোটের অধীনে নয়, বরং এককভাবে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানকেন্দ্রিক গড়ে ওঠা তরুণদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলের সাংগঠনিক ভিত্তি তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত মজবুত করতেই এই কৌশল নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন দলটির শীর্ষ নেতারা।
একক নির্বাচনের সিদ্ধান্ত ও প্রস্তুতি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন একসঙ্গে করলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এখন পর্যন্ত আলাদা পথে হাঁটছে জামায়াত ও এনসিপি। দল দুটি ইতোমধ্যে আলাদাভাবে প্রার্থীও ঘোষণা করছে। এতে ১১ দলীয় জোটে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তবে শুধু সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে 'ঐক্য' হতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে।
এ প্রসঙ্গে বৃহস্পতিবার এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া যুগান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, 'এনসিপি আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রতিটি স্তরে ব্যাপকভাবে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এখন পর্যন্ত এককভাবে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত আছে। এজন্য তৃণমূলে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছি।'
তিনি আরও বলেন, 'স্থানীয় সরকার নির্বাচনও ঐক্যের ব্যানারে হোক কেউ কেউ চাচ্ছেন। আবার অনেকেই আলাদা নির্বাচনের পক্ষে মতপ্রকাশ করছেন। এ ব্যাপারে দুই দলের মধ্যে কার্যকর কোনো আলোচনা হয়নি। এখনো সময় আছে আলোচনায় বসার।'
প্রার্থী বাছাইয়ে চমক
এনসিপি সূত্রে জানা যায়, সিটি করপোরেশন থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সদস্য পদেও প্রার্থী দেওয়া হবে। প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়ায়ও থাকবে চমক। বিএনপি কিংবা অন্যান্য দল থেকে বহিষ্কৃত কিংবা সরে দাঁড়ানো নেতারাও এনসিপিতে যুক্ত হচ্ছেন। নেতাদের নামও আসছে প্রার্থী তালিকায়।
দলটির নেতারা মনে করেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তারা ভালো করতে পারবেন। ইতোমধ্যে ৩৩টি পৌরসভার মেয়র, ৬৭টি উপজেলার চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী ঘোষণা হয়েছে। এসব এলাকায় ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে। দ্রুতই আরও ১০০ উপজেলা-পৌরসভায় প্রার্থী ঘোষণা হবে। নেতারা মনে করেন, মাঠপর্যায়ে এনসিপি ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। বিভিন্ন দল থেকে অনেকেই এনসিপিতে যোগ দিচ্ছেন।
এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব পদে থাকা এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, 'দলে আনতে বিভিন্ন দলের প্রভাবশালী নেতাকে টার্গেট করা হচ্ছে।'
সিটি নির্বাচনে নজর
ঢাকার দুই সিটি নির্বাচন ঘিরে ১১ দলীয় জোটে চলছে নানা হিসাবনিকাশ। সম্ভাব্য প্রার্থী নির্ধারণ, জোটগত সমন্বয় এবং দলীয় কৌশলে নির্বাচন নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন সমীকরণ। ঢাকা দক্ষিণে দুই দলের তরুণ দুই প্রার্থী আসিফ মাহমুদ ও ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েমকে নিয়ে আলোচনা থাকায় অনেকটা নীরব দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে নেতাকর্মীদের মনে।
সাদিক কায়েমকে ঢাকা দক্ষিণের মেয়র প্রার্থী করতে চাইছে জামায়াত। কয়েক মাস আগে জামায়াতের ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের দায়িত্বশীল সম্মেলনে প্রার্থী হিসাবে সাদিক কায়েমের নাম প্রস্তাব করা হয়। যদিও দলটির পক্ষ থেকে এটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয় বলে স্পষ্ট করা হয়েছে। কিন্তু আরও আগেই এনসিপির মুখপাত্র ও সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদকে ঢাকা দক্ষিণের প্রার্থী করা হয়েছে। তার পক্ষে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণাও চালাচ্ছে এনসিপি।
এছাড়া ঢাকা উত্তর সিটিতে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব ও কুমিল্লা সিটির প্রার্থী হিসাবে জাতীয় যুবশক্তির সভাপতি তারিকুল ইসলামের নাম ঘোষণা করা হয়েছে।
নেতাদের বক্তব্য
কুমিল্লা সিটি মেয়র নির্বাচনে এনসিপির প্রার্থী তরিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, 'আমাদের প্রচার-প্রচারণা চলছে। স্থানীয়ভাবে সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে। আমরা মনে করেছিলাম নির্বাচিত সরকার এলে সব সমস্যার সমাধান হবে। আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন হবে। সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি; বরং দিন দিন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বেড়েই চলেছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এর প্রভাব পড়বে। ফলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কি না তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।'
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বলেন, 'স্থানীয় সরকার নির্বাচনও আমাদের জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে অংশ নিলে আমি মনে করি, প্রতিটি ইউনিটে এনসিপির সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি হবে।'
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনসিপির সাবেক শীর্ষ এক নেত্রী যুগান্তরকে বলেন, 'আমি মনে করি, এনসিপির শীর্ষ নেতারা জামায়াতের হয়েই কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন। এনসিপি এখন পুরোপুরি ডানপন্থি একটি দল। দিনশেষে তারা জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ নির্বাচনেই যেতে পারে। এমনটা হলে এনসিপি থেকে আরও শীর্ষ নেতারা অব্যাহতি নেবেন।'



