চট্টগ্রামের রাউজানের কদলপুর ইউনিয়নে যুবদল কর্মী মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। রোববার রাত ১০টার দিকে শমসের পাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের বরাত দিয়ে জানা গেছে, নাসির উদ্দিন বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে ওত পেতে থাকা সন্ত্রাসীরা তাঁর পথ রোধ করে এবং ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। এরপর মাটিতে পড়ে যাওয়া নাসিরের বুকে ও পিঠে সাত-আটটি গুলি করে তারা। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে রাত ১২টার দিকে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার বিবরণ
ঘটনার সময় পুরো এলাকা বিদ্যুৎহীন ও অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল। চাঁদের ফিকে আলোয় পাশের একটি বাড়ির বাসিন্দা পুরো ঘটনা দেখতে পান। নাম প্রকাশ না করে তিনি প্রথম আলোকে জানান, সন্ত্রাসীরা আগে থেকেই ওই স্থানে অবস্থান করছিল। নাসিরকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার পর পরপর গুলি চালানো হয়।
পূর্বের হামলা ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
নাসির উদ্দিন এর আগেও হামলার শিকার হন। ২০২৫ সালে আরেক দল সন্ত্রাসী তাঁকে কুপিয়ে জখম করেছিল। তখন তিনি দীর্ঘদিন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সম্প্রতি সুস্থ হয়ে গ্রামে ফেরার পর আবারও হামলার শিকার হন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কদলপুর ইউনিয়ন পাহাড় ও টিলাভূমিতে ঘেরা। এখানে পাহাড়ের মাটি কাটা, ছড়া থেকে বালু উত্তোলন, কাঠ পাচার ও গাছ কাটার মতো অপরাধের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল আওয়ামী লীগের নেতাদের হাতে। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর এসবের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয় স্থানীয় বিএনপি-যুবদলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে। এর জের ধরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অন্তত পাঁচ থেকে সাতজনকে গুলি করা হয়। খুন হন নাসির উদ্দিনসহ তিনজন।
হত্যাকাণ্ডের স্থান ও এলাকার অবস্থা
উপজেলা সদর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে কলদপুর ইউনিয়নের পুরোনো বাজার ইশানভট্টের হাট। এর একপাশে কদলপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ। কলেজের পাশ ধরে আধা কিলোমিটার গেলে শমসের পাড়া গ্রাম। সোমবার দুপুরে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের পুরুষ মানুষের সংখ্যা কম। নারী ও শিশুদের জটলা দেখা যায়। সড়ক ধরে কিছু দূর গেলে একটি সীমানাপ্রাচীর ঘেরা বাড়ি, তার সামনে হেলে পড়া বাঁশের বেড়া। কয়েকজন নারী জানান, এই জায়গায় নাসিরকে ফেলে দেওয়া হয় এবং পরে গুলি করে হত্যা করা হয়।
গ্রামের নারীরা হত্যাকাণ্ড নিয়ে খোলামেলা কথা বলতে রাজি হননি। তাঁদের চোখে-মুখে ও কথায় আতঙ্কের ছাপ দেখা গেছে। ঘটনাস্থলের ৫০০ মিটার দূরত্বে নাসিরের বড় ভাই আকতার হোসেনের নতুন বাড়ি। নাসিরের নতুন ঘর তাঁর ভাইয়ের বাড়ি থেকে আরও দেড় কিলোমিটার দূরে পাহাড়ের গহিনে। তাই লাশ সেখানে নেওয়া হবে না। লাশ আনা হবে বড় ভাইয়ের বাড়িতে। মাগরিবের নামাজের পর জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে।
পরিবারের বক্তব্য
নাসিরের বড় ভাই আকতার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, 'নাসির রাজনীতি করতেন। রাজনৈতিকভাবে তাঁর শত্রু ছিল, যার কারণে গত এক বছর আগেও হামলা হয়েছিল। কিন্তু তখন বেঁচে গিয়েছিলেন। এবার গুলিতে ঝাঁজরা হয়ে গেলেন। আমার ভাইয়ের ব্যক্তিগত শত্রু নেই, যা ঘটেছে রাজনীতির কারণে ঘটেছে।'
নিহতের একমাত্র মেয়ে লাভলী আকতার বলেন, 'আমার বাবা এক সময়ে প্রবাসী ছিলেন। পরে দেশে এসে বিএনপির রাজনীতি করতেন। গতকাল রাতে গ্রামের এক ব্যক্তির বাড়িতে আগে থেকে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অবস্থান করছিল সন্ত্রাসীরা। বাবা বাজার থেকে ফেরার পথে ওই বাড়ি থেকে বের হয়ে একের পর এক গুলি করে হত্যা করা হয় তাঁকে। বাবার হত্যাকারী কারা, আমরা জানি। তাঁদের ফাঁসি চাই।'
পুলিশের বক্তব্য
রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাজেদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, 'কদলপুরে সন্ত্রাসী যুবদলের কিছু কর্মীদের মধ্যে বালু উত্তোলন ও মাটি কাটা, পাহাড়-টিলা দখল নিয়ে দ্বন্দ্ব আছে দীর্ঘদিনের। এ কারণে প্রায় এখানে সংঘাত ঘটে। নাসিরের হত্যা সেটিরই অংশ। নাসিরের বিরুদ্ধেও পাঁচটি মামলা রয়েছে থানায়। আমরা পরিবারকে মামলা দিতে বলেছি। সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছি।'
পুলিশ জানিয়েছে, নাসির উদ্দিন অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে থানায় পাঁচটি মামলা ছিল। আজ বিকেল পর্যন্ত নাসির হত্যায় মামলা করেনি পরিবার। তবে সন্ধ্যার পরে পরিবারকে থানায় এসে মামলা করতে বলা হয়েছে।
সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের পরিসংখ্যান
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে রাউজানের কদলপুরে সন্ত্রাসীদের হাতে মোট তিনজন খুন হন বলে পুলিশ জানিয়েছে। তাঁদের মধ্যে আছেন যুবদল কর্মী মুহাম্মদ সেলিম (৪০), সেলিমের সহযোগী মুহাম্মদ দিদারুল আলম (৩৮) এবং সর্বশেষ মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন (৪৫)। এ ছাড়া এই ইউনিয়নে পাঁচ থেকে সাতজন গত ২০ মাসে গুলিবিদ্ধ হন। অন্তত অর্ধশতাধিকবার গোলাগুলির ঘটনা ঘটে এই ইউনিয়নে, যার কারণে পুরো ইউনিয়নের বাসিন্দারা থাকেন চরম আতঙ্কে।
চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের সহসভাপতি সাবের সুলতান বলেন, নাসির তাঁদের দলের নিবেদিত কর্মী ছিলেন। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর অনুসারী ছিলেন। রাউজানে একের পর এক হত্যাকাণ্ড বন্ধে প্রশাসনের প্রতি কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।



