হজ করতে গিয়ে মক্কা বা মদিনায় হারিয়ে গেলেও আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। সঠিক প্রস্তুতি ও কিছু সহজ পদ্ধতি অনুসরণ করলে যেকোনো হজযাত্রী সহজেই নিজের গন্তব্যে ফিরে আসতে পারেন। প্রথম ও প্রধান কাজ হলো নুসুক কার্ড, মিনার তাঁবু কার্ড, হোটেলের কার্ড ও মোয়াল্লেমের মোবাইল নম্বর সংগ্রহে রাখা। এই তথ্যগুলো সঙ্গে থাকলে বিপদ থেকে সহজেই রক্ষা পাওয়া যায়।
হারিয়ে গেলে প্রথম করণীয়
হজ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কায় এসে অনেক হজযাত্রী পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার আগেই সঙ্গীদের হারিয়ে ফেলেন। হঠাৎ দলছুট হয়ে গেলে তারা দিশেহারা হয়ে পড়েন এবং তাওয়াফ ও সাঈ যথাযথভাবে সম্পন্ন করতেও সমস্যায় পড়েন। তবে চিন্তার কিছু নেই—এ ধরনের পরিস্থিতিতে সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে। স্থানীয় প্রবাসী বাংলাদেশি, সৌদি কর্মী কিংবা মক্কার মিসফালা এলাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ হজ কার্যালয় এবং মদিনায় মসজিদে নববির ফাহাদ গেট দিয়ে বের হয়ে বাঙালি মার্কেটের পাশের আল মাসানিয়া এলাকার বাংলাদেশ হজ অফিসে হারানো হজযাত্রীদের পৌঁছে দেওয়া হয়।
ওমরাহ পালনের সময় সতর্কতা
সাধারণত সৌদি আরবে পৌঁছে মক্কায় নির্ধারিত বাসায় মালপত্র রেখে হজযাত্রীরা ওমরাহ পালনের জন্য বের হন। কিন্তু অনেকেই তাড়াহুড়ার মধ্যে তাওয়াফ ও সাঈ শুরু করতে গিয়ে পরিবেশ বুঝে ওঠার আগেই সঙ্গীদের হারিয়ে ফেলেন। মসজিদুল হারাম অত্যন্ত বিশাল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত, যেখানে প্রায় ২০০টির মতো প্রবেশপথ রয়েছে। উপরন্তু, সম্প্রসারণ কাজ চলমান থাকায় ভেতরে-বাইরে নির্মাণকাজও থাকে। ফলে গেটগুলো দেখতে প্রায় একই রকম হলেও নাম ও নম্বর ভিন্ন হওয়ায় বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
নির্ধারিত স্থান নির্ধারণ
বিশেষ করে তাওয়াফ ও সাঈর সময় অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে হজযাত্রীরা বেশি হারিয়ে যান। তাই আগে থেকেই সঙ্গীদের নির্দিষ্ট করে বুঝিয়ে রাখা জরুরি—যদি বিচ্ছিন্ন হয়ে যান, তাহলে কোথায় গিয়ে অপেক্ষা করবেন। যেমন, তাওয়াফ শেষে কোথায় নামাজ আদায় করবেন তা নির্ধারণ করে রাখা যেতে পারে। আবার সাঈ চলাকালে সাফা বা মারওয়া পাহাড়কে অপেক্ষার স্থান হিসেবে নির্ধারণ করা যেতে পারে।
সহায়তা কেন্দ্র
মক্কা ও মদিনার হজ কার্যালয় এবং আইটি হেল্প ডেস্ক থেকে মোয়াল্লেম বা সংশ্লিষ্ট এজেন্সির মাধ্যমে হারানো হজযাত্রীদের নিজ নিজ আবাসস্থলে পৌঁছে দেওয়া হয়। মসজিদুল হারামের নির্দিষ্ট প্রবেশপথ মনে রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেমন—বাদশা ফাহাদ গেট (৭৯ নম্বর প্রবেশপথ)। ভিড়ের কারণে হারিয়ে গেলে এই নির্দিষ্ট গেটেই অপেক্ষা করা নিরাপদ।
মসজিদে নববিতে করণীয়
একইভাবে, মসজিদে নববির উত্তর দিকে (ওহুদ পাহাড়মুখী) কিং ফাহাদ গেট বা ২১ নম্বর প্রবেশপথ নির্ধারণ করে রাখা যেতে পারে, যাতে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে সেখানে গিয়ে অপেক্ষা করা যায়। সবসময় নিজের কাছে সঙ্গীর মোবাইল নম্বর, এজেন্সির নাম এবং দলনেতার যোগাযোগ নম্বর লিখে রাখুন। এতে হারিয়ে গেলেও যোগাযোগ করা সহজ হবে। পাশাপাশি নির্ধারিত স্থানে ধৈর্যসহ অপেক্ষা করা উচিত।
মানচিত্র ব্যবহার
মিনা ও আরাফাতে পথ হারানোর আশঙ্কা কমাতে মানচিত্র ব্যবহার অত্যন্ত কার্যকর। হজের পাঁচ দিনের মধ্যে চার দিন মিনায় এবং এক দিন আরাফাত ও মুজদালিফায় অবস্থান করতে হয়, তাই এসব স্থানের ধারণা থাকা জরুরি। মক্কা, মদিনা, মিনা ও আরাফাতের মানচিত্র কাগজে কিংবা অনলাইনে সহজেই পাওয়া যায়। আগেভাগে এসব মানচিত্র দেখে নিলে রাস্তাঘাট ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানের বিষয়ে ধারণা পাওয়া যায়।
মিনার গুরুত্বপূর্ণ স্থান
বিশেষ করে মিনার মানচিত্র ভালোভাবে বুঝে নিলে চলাচল অনেক সহজ হয়ে যায়। মিনার কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থান নিজে চিনে নিলে পথ হারানোর সম্ভাবনা অনেক কমে যায়। যেমন—জামারা (শয়তানকে পাথর নিক্ষেপের স্থান), মসজিদে খায়েফ, মিনার তিনটি সেতু (বাদশাহ খালিদ ব্রিজ ১৫ নম্বর, বাদশাহ আবদুল্লাহ ব্রিজ ২৫ নম্বর, বাদশাহ ফয়সাল ব্রিজ ৩৫ নম্বর) এবং হাঁটার পথ (টিনশেড)।
মিনার সড়ক ও জোন
মিনায় মোট সাতটি জোন রয়েছে এবং বড় বড় সড়কগুলো ভিন্ন নাম ও নম্বর দ্বারা চিহ্নিত। এই নাম ও নম্বর জানা থাকলে চলাচল অনেক সহজ হয়। উল্লেখযোগ্য সড়কগুলোর মধ্যে রয়েছে—বাদশাহ ফয়সাল ৫০ নম্বর রোড, আলজাওহারাত ৫৬ নম্বর রোড, সুকুল আরব ৬২ নম্বর রোড এবং বাদশাহ ফাহাদ ৬৮ নম্বর রোড।
রেলস্টেশন ও অন্যান্য স্থাপনা
মিনায় তিনটি এবং মুজদালিফায় তিনটি রেলস্টেশন রয়েছে। এছাড়াও সুড়ঙ্গপথ, টানেল, হাঁটার রাস্তা, হাসপাতাল, মসজিদ, বাদশাহ বাড়ি, রয়েল গেস্টহাউস ও মোয়াচ্ছাসা কার্যালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে।
তাঁবু ও মোয়াল্লেম নম্বর
মিনায় মোয়াল্লেম নম্বর বা তাঁবু নম্বর জানা না থাকলে সহজেই পথ হারানোর আশঙ্কা থাকে। তাই এই তথ্য আগে থেকেই জেনে রাখা জরুরি। হজ শুরু হওয়ার তিন দিন আগে মক্কায় বাংলাদেশ হজ কার্যালয়ের আইটি হেল্প ডেস্ক থেকে ২০২৬ সালের ছাপা ম্যাপ সংগ্রহ করা যাবে। এই ম্যাপ সম্পর্কে ধারণা থাকলে পথ হারানোর সম্ভাবনা অনেক কমে যায়।
ম্যাপের বিবরণ
ম্যাপে রাস্তা, ব্রিজসহ অন্যান্য স্থাপনা সাধারণত একই থাকে, শুধু মোয়াল্লেম ও তাঁবুর নম্বর পরিবর্তিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো তাঁবুর নম্বর হয় ১২/৫৬—তাহলে ওপরের সংখ্যা ১২ হলো তাঁবুর নম্বর এবং নিচের ৫৬ হলো রাস্তার নম্বর। মোয়াল্লেম অফিস থেকে সাধারণত তাঁবুর নম্বরসহ একটি কার্ড দেওয়া হয়। বাইরে বের হওয়ার সময় নুসুক কার্ড এবং তাঁবুর কার্ড সঙ্গে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে নিজের তাঁবুটি ভালোভাবে চিনে রাখা উচিত।
পথ চলার প্রস্তুতি
মিনায় জামারা থেকে নিজের তাঁবুর অবস্থান এবং তাঁবু থেকে মসজিদুল হারামে যাতায়াতের পথ সম্পর্কে আগে থেকেই ধারণা নেওয়া প্রয়োজন। ভিড় এড়াতে অনেকেই হাঁটার জন্য টানেল বা সুড়ঙ্গপথ ব্যবহার করেন। এই পথগুলো চিনতে স্থানীয় বাংলাদেশিদের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে অথবা গুগল ম্যাপ ব্যবহার করা যেতে পারে।
প্রযুক্তির সহায়তা
বর্তমানে অনেক হজযাত্রী ট্যাবলেট বা আইফোন সঙ্গে নিয়ে যান। হজ ও পিলগ্রিম-সংক্রান্ত অ্যাপ ব্যবহার করে অবস্থান, রাস্তাঘাট ও প্রয়োজনীয় তথ্য সহজেই জানা সম্ভব। এসব অ্যাপ হজযাত্রীদের জন্য অত্যন্ত উপকারী হতে পারে।



