নির্বাচনে অপতথ্যের ছড়াছড়ি: ডিসমিসল্যাবের প্রতিবেদনে উদ্বেগজনক চিত্র
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো অপতথ্যের একটি বড় অংশ ভোটসংশ্লিষ্ট ছিল বলে উঠে এসেছে তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাবের প্রতিবেদনে। গত শনিবার প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার দিন থেকে ভোট গ্রহণের পরের এক সপ্তাহ পর্যন্ত ছড়ানো অপতথ্যের ৪৫ শতাংশই ভোটসংক্রান্ত, যা সংখ্যায় দাঁড়ায় ৫২৮টি।
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনকালে অপতথ্য ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে, যা আগে থেকেই আশঙ্কা করা হচ্ছিল। তবে নির্বাচন কমিশন এই অপতথ্য ঠেকাতে তেমন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি। বিষয়টি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, "অপতথ্য মোকাবিলায় নির্বাচন কমিশনের পক্ষে সব পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব নয়। তবে ন্যূনতম যে উদ্যোগ নেওয়া দরকার, সেটিই দৃশ্যমান ছিল না।"
অপতথ্যের ধরন ও সময়সূচি
ডিসমিসল্যাবের প্রতিবেদনে জানানো হয়, গত বছরের ১১ ডিসেম্বর থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সামাজিক মাধ্যমে ১ হাজার ১৮৫টি রাজনৈতিক অপতথ্য যাচাই করা হয়েছে। দেশে কাজ করা নয়টি তথ্য যাচাইকারী সংস্থার ৭২ দিনের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। অপতথ্যগুলোকে সময়সূচি অনুযায়ী ভাগ করে দেখা গেছে:
- নির্বাচনী প্রচারের ১৯ দিনে প্রতিদিন গড়ে ১১ থেকে ১২টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে।
- মনোনয়ন যাচাই-বাছাই পর্যায়ে এই হার ছিল প্রতিদিন গড়ে ৫টির কম।
- ভোটের দিন ২৪ ঘণ্টায় ছড়িয়েছে ২৬টি অপতথ্য।
- ভোটের পরের সপ্তাহে হার কিছুটা কমলেও প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয়টি দাবি যাচাই করা হয়েছে।
এআই-তৈরি অপতথ্যের প্রভাব
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, নির্বাচনের আগে-পরে মিলিয়ে ৭২ দিনে গড়ে প্রতিদিন দুটির বেশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট অপতথ্যের প্রায় ১২ শতাংশ ছিল এআই দিয়ে তৈরি, যার মধ্যে প্রতি ১০টির ৭টি ভিডিওভিত্তিক। অপতথ্যের ধরনগুলোর মধ্যে ছিল:
- নির্বাচন আদৌ হবে কি না, সেই সন্দেহ তুলে ধরে গুজব ছড়ানো।
- প্রার্থীদের নামে অতিরঞ্জিত বা মনগড়া প্রতিশ্রুতি প্রচার।
- সমাবেশের এআই-তৈরি ছবিতে উপস্থিতির সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানো।
- পুরোনো বিক্ষোভ বা সহিংসতার ভিডিও নতুন করে ছড়িয়ে চলমান সংঘর্ষ হিসেবে উপস্থাপন।
ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও অপতথ্য মোকাবিলা বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে মন্তব্য করেছেন অধ্যাপক মইনুল। তিনি বলেন, "স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অপতথ্য ছড়াবে এলাকাভিত্তিক। তাই পদক্ষেপও নিতে হবে উপজেলা এবং থানাকে কেন্দ্র করে। আগে থেকেই সংশ্লিষ্টদের এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নিতে নির্বাচন কমিশনকে বার্তা দিতে হবে।" ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরীও এই বিষয়টিকে শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখছেন এবং ভবিষ্যতের নির্বাচনের জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
এই প্রতিবেদনটি নির্বাচনী সময়ে অপতথ্যের ব্যাপকতা এবং এর মোকাবিলায় প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের ঘাটতি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে।



