পুলিশের ইউনিফর্ম আবারও পরিবর্তনের উদ্যোগ: নতুন রঙের প্রস্তাব জিওর অপেক্ষায়
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে চালু করা নতুন ইউনিফর্ম নিয়ে মাঠপর্যায়ে ব্যাপক অসন্তোষের পর আবারও পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাহিনীর সদস্যদের মতামত ও জনমতের প্রেক্ষাপটে ইউনিফর্মের রঙ পুনর্নির্ধারণ করে ‘পুলিশ ড্রেস রুলস-২০২৫’ সংশোধনের প্রস্তাব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে পুলিশ সদর দফতর। প্রস্তাব অনুমোদন পেলেই নতুন পোশাক চালু হবে ধাপে ধাপে, এখন পুরো প্রক্রিয়া আটকে আছে সরকারি আদেশ (জিও) জারির অপেক্ষায়।
পুলিশ সপ্তাহের আগেই নতুন পোশাকের আশা
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানা গেছে, আগামী ১০ মে শুরু হতে যাওয়া পুলিশের সবচেয়ে বড় বার্ষিক আয়োজন ‘পুলিশ সপ্তাহ’র আগেই নতুন পোশাক পাওয়ার আশা করেছিলেন সদস্যরা। তবে এখনও জিও না হওয়ায় সেটি সম্ভব হচ্ছে না। সরকারি আদেশ জারির পর পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে আরও সময় প্রয়োজন হবে বলে জানানো হয়েছে।
নতুন প্রস্তাবের মূল বৈশিষ্ট্য
সম্প্রতি পুলিশ সদর দফতরের লজিস্টিকস শাখার অতিরিক্ত ডিআইজি মো. সারোয়ার জাহান সই করা এক চিঠিতে পোশাক পরিবর্তনের প্রস্তাব পাঠানো হয়। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী ইউনিটভেদে শার্টের রঙে ভিন্নতা আনার পরিকল্পনা রয়েছে:
- মহানগর পুলিশের জন্য হালকা জলপাই রঙের শার্ট নির্ধারণের চিন্তা করা হচ্ছে।
- অন্যান্য ইউনিটের জন্য গাঢ় নীল শার্ট প্রস্তাবিত হয়েছে।
- সব ইউনিটে প্যান্ট খাকি রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এতে একরঙা পোশাকের পরিবর্তে সমন্বিত রঙের ইউনিফর্ম চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা ব্যবহারিক সুবিধা ও আলাদা পরিচিতি নিশ্চিত করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
পূর্ববর্তী ইউনিফর্ম পরিবর্তন ও অসন্তোষ
এর আগে ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ধাপে ধাপে লৌহবর্ণ (আইরন গ্রে) ইউনিফর্ম চালু করা হয়। প্রথম পর্যায়ে মহানগর ও বিশেষায়িত ইউনিটে এটি কার্যকর করা হয় এবং পরবর্তীতে জেলা ও রেঞ্জ পর্যায়ে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা ছিল। ওই পরিবর্তনকে বাহিনীর আধুনিকায়ন ও নতুন ভাবমূর্তি তৈরির অংশ হিসেবে দেখা হয়েছিল।
তবে বাস্তবায়নের পরপরই নতুন পোশাক নিয়ে অসন্তোষ দেখা দেয়। মাঠপর্যায়ের অনেক সদস্য অভিযোগ করেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের মতামত প্রতিফলিত হয়নি। কেউ কেউ বলেন, নতুন রঙের কারণে অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে বিভ্রান্তির সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। আবার দীর্ঘদিনের প্রচলিত খাকি পোশাক থেকে সরে আসায় বাহিনীর ঐতিহ্য ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করা হয়। আবহাওয়া ও দায়িত্বের ধরন অনুযায়ী পোশাকটির ব্যবহারিক উপযোগিতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
জনমত ও পুনর্বিবেচনা
সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন পরিসরে ইউনিফর্মের রঙ ও নকশা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয়, যা বিষয়টি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা সামনে আনে। এ পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি পুনরায় পর্যালোচনায় নেয়।
অর্থনৈতিক দিক ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা
কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন প্রস্তাব বাস্তবায়নে অতিরিক্ত বড় কোনও ব্যয়ের প্রয়োজন হবে না। নিয়মিত সরবরাহ ব্যবস্থার মধ্যেই ধাপে ধাপে পুরোনো ইউনিফর্ম প্রতিস্থাপন করা সম্ভব। গত ১৫ এপ্রিল পুলিশ সদর দফতরের লজিস্টিকস শাখা থেকে পাঠানো প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়, ইউনিফর্ম সরবরাহ যেহেতু প্রাপ্যতার ভিত্তিতে হয়ে থাকে, তাই এই পরিবর্তনে সরকারের অতিরিক্ত আর্থিক ব্যয় হবে না।
পুলিশ সদর দফতরের লজিস্টিক বিভাগের ডিআইজি সারোয়ার মুর্শেদ শামীম বলেন, “পোশাক পরিবর্তনের জন্য সরকারের অতিরিক্ত আর্থিক ব্যয়ের প্রয়োজন হবে না। পুলিশ সদস্যদের বার্ষিক প্রাপ্যতার ভিত্তিতেই ইউনিফর্ম সরবরাহ করা হয়। প্রজ্ঞাপন জারি হলে পরবর্তী বিতরণের সময় নতুন রঙের পোশাক দেওয়া হবে।”
বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
অতিরিক্ত ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা বলেন, “আমরা চেয়েছিলাম পুলিশ সপ্তাহের আগেই পোশাক পরিবর্তন নিশ্চিত করতে। মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বিধি সংশোধনের কাজ শেষ হয়েছে। এখন সরকারের সিদ্ধান্ত হলেই দ্রুত বাস্তবায়ন সম্ভব।”
পুলিশ সদর দফতরের লজিস্টিকস শাখার অতিরিক্ত ডিআইজি মো. সারোয়ার জাহান বলেন, “পোশাক পরিবর্তনের বিষয়ে এখনও সরকারি আদেশ (জিও) হয়নি। আমরা জিও’র অপেক্ষায় আছি। জিও জারি হলেও পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কিছুটা সময় লাগবে।”
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগ ও আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ পুলিশ সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়ে। বাহিনীকে ট্রমা কাটিয়ে কর্মচাঞ্চল্যে ফেরাতে পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অন্তর্বর্তী সরকার পুলিশ, র্যাব ও অঙ্গীভূত আনসার বাহিনীর পোশাক পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়। গতবছরের জানুয়ারিতে তিন বাহিনীর জন্য নতুন ইউনিফর্ম নির্ধারণ করা হলেও সমালোচনার মুখে র্যাব ও আনসারের পোশাকে আর পরিবর্তন আনা হয়নি।
১৫ নভেম্বর থেকে ঢাকা মহানগর পুলিশসহ দেশের সব মহানগর ও বিশেষায়িত ইউনিটে লৌহবর্ণ ইউনিফর্ম চালু করা হয়। র্যাবের পোশাক নির্ধারণ করা হয় জলপাই (অলিভ) রঙে এবং আনসারের পোশাক সোনালি গম (গোল্ডেন হুইট) রঙে।
প্রায় ২১ বছর পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পোশাকে পরিবর্তন আনা হয়। এর আগে সর্বশেষ ২০০৪ সালে পুলিশের ইউনিফর্ম পরিবর্তন করা হয়েছিল। সরকার পুলিশ সদর দফতরের পাঠানো বিধি সংশোধনের প্রস্তাব অনুমোদন করলে আবারও বদলে যাবে পুলিশের পোশাক।
পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, পুলিশ সদস্যদের বছরে পাঁচ সেট ইউনিফর্ম দেওয়া হয় সরকারিভাবে। এক বছরের ব্যবধানে ইউনিফর্ম নিয়ে ধারাবাহিক এই পরিবর্তনকে অনেকে গ্রহণযোগ্যতা ও সমন্বয় তৈরির চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছেন। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে পুলিশের জন্য একটি স্থিতিশীল ও কার্যকর ইউনিফর্ম কাঠামো নির্ধারিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।



