চীন সফররত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে গণচীনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল ২০২৬) চীনের আইডিসিপিসি ভবনে এই বৈঠকগুলো সম্পন্ন হয়, যেখানে বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে দলটি অংশগ্রহণ করে।
দুটি পৃথক বৈঠকে আলোচনার বিস্তার
বিএনপি প্রতিনিধিদল প্রথমে চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হান জেং-এর সাথে গ্রেট হল অন দ্য পিপলে এবং পরে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইশিংয়ের সঙ্গে পৃথক দুটি বৈঠকে মিলিত হয়। বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবীর খান এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন, জানিয়েছেন যে উভয় পক্ষ বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা করেছেন।
ঐতিহাসিক সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতা
সভায় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কর্তৃক বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের মৈত্রী দৃঢ়করণের সূচনা এবং প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে এর বিকাশের বিষয়গুলো উঠে আসে। পাশাপাশি, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে এ সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় উন্নীতকরণের বিষয়ে উভয় পক্ষ দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন। বাংলাদেশ-চীন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে ব্যাপক কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারিত্ব হিসেবে বর্ণনা করা হয়, যা দুই দেশের মধ্যে গভীর আস্থা ও বহুমাত্রিক সহযোগিতার প্রতিফলন ঘটায়।
সমঝোতা স্মারক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়ন
চীনের সিপিসি এবং বিএনপির মধ্যকার সম্পর্ক উন্নয়ন, দ্বিপাক্ষিক সফর এবং নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক মতবিনিময়ের লক্ষ্যে উভয় পক্ষ একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের বিষয়ে কাজ করতে সম্মত হয়েছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বৈঠক শেষে বলেন, "জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও জনগণের কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবং ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে সামনে রেখে বর্তমান সরকার বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ও বৈদেশিক নীতি প্রণয়ন করেছে।" তিনি এক-চীন নীতির প্রতি বাংলাদেশের দৃঢ় সমর্থনও পুনর্ব্যক্ত করেন।
বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ইস্যুতে আলোচনা
রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, মানবিক এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় চীনের অব্যাহত সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং টেকসই ও স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে চীনের গঠনমূলক ভূমিকার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার সাথে জড়িত তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে চীনের সদিচ্ছা ও অংশীদারিত্বের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
বহুমুখী সহযোগিতার ক্ষেত্রসমূহ
বৈঠকে নিম্নলিখিত ক্ষেত্রগুলোতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়:
- চীনা ভাষা, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময় বৃদ্ধির মাধ্যমে দুই দেশের জনগণের মধ্যে বোঝাপড়া ও অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা জোরদার করা।
- প্রতিরক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি ও জ্ঞান বিনিময়।
- আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, উন্নত পানি পরিশোধন প্রযুক্তি এবং গ্রামীণ উন্নয়নে চীনের সাফল্য থেকে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা অর্জন।
- নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সবুজ শক্তি, বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং ব্যাটারিসহ হালকা ও মাঝারি শিল্পে সহযোগিতা।
স্বাস্থ্য ও প্রশিক্ষণ খাতে সহযোগিতা
বাংলাদেশে প্রস্তাবিত বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী হাসপাতালের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, রোবোটিক সার্জারি ও আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তিতে সহযোগিতা, টিকাদান কর্মসূচি এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে চীনের অব্যাহত সমর্থন প্রত্যাশিত। পাশাপাশি, চীনের সহযোগিতায় বাংলাদেশে কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য প্রশিক্ষণ সুযোগ বৃদ্ধির আশাও ব্যক্ত করেন তিনি।
চীনের প্রতিক্রিয়া ও যৌথ অঙ্গীকার
গণচীনের উপ-রাষ্ট্রপতি এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী উভয়ই বাংলাদেশকে তাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী ও অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করেন এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে সম্পর্ককে আরও গভীর করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তারা বাংলাদেশের সঙ্গে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন এবং পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে যৌথ অগ্রগতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
উভয় বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সামগ্রিক অগ্রগতি, ভবিষ্যৎ সহযোগিতার দিকনির্দেশনা এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হয়। উভয় পক্ষই পারস্পরিক সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ককে আরও উচ্চতর পর্যায়ে উন্নীত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। এ ধরনের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ ও সংলাপ বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে আরও সুসংহত করবে এবং ভবিষ্যতে বহুমাত্রিক সহযোগিতার নতুন দ্বার উন্মোচন করবে বলে উভয় পক্ষই আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বিএনপি প্রতিনিধিদলের সদস্যবৃন্দ
বিএনপি প্রতিনিধিদলে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সংসদ সদস্য এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী, সাবেক এমপি ও ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান রিপন, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকন, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন-নবী খান সোহেল, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য নজমুল হক নান্নু, বেবি নাজনীন, সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক আশরাফ উদ্দিন আহমেদ উজ্জ্বল, স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম সহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ।



