গণভোটের রায় বাস্তবায়নে ১১-দলীয় ঐক্যের ধারাবাহিক আন্দোলন
গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য একটি ব্যাপক কর্মসূচির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। গত ১৮ এপ্রিল ঢাকায় গণমিছিলের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ধাপে ধাপে বিভাগীয় শহর, জেলা শহর এবং শেষে রাজধানীতে মহাসমাবেশে রূপ নেবে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো ক্ষমতাসীন সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বৃদ্ধি করা এবং গণভোটের ফলাফল অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের দাবি জোরদার করা।
ধাপে ধাপে কর্মসূচির বিস্তারিত পরিকল্পনা
১১-দলীয় ঐক্যের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বর্তমান কর্মসূচিগুলো জনমত গঠন ও সাংগঠনিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। মাঠের পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া মূল্যায়ন করে আগামী দিনগুলোতে কর্মসূচির পরিধি আরও বিস্তৃত করা হবে। প্রয়োজনে আরও কঠোর পদক্ষেপের দিকেও যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
গত ৯ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে সারা দেশে লিফলেট বিলি, মহানগর ও জেলা পর্যায়ে বিক্ষোভ এবং ১৩ এপ্রিল ঢাকায় একটি জাতীয় সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। এরপর ১৬ এপ্রিল রাজধানীর মগবাজারে আল ফালাহ মিলনায়তনে ১১ দলের শীর্ষ নেতাদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ১৮ এপ্রিল থেকে ২ মে পর্যন্ত নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
এই কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ১৮ এপ্রিল ঢাকায় গণমিছিল, ২৫ এপ্রিল বিভাগীয় শহরগুলোয় এবং ২ মে জেলা শহরগুলোয় গণমিছিল। পাশাপাশি, এই সময়ের মধ্যে বিভাগীয় শহর ও গুরুত্বপূর্ণ জেলা শহরে সেমিনার এবং লিফলেট বিলির কার্যক্রম চলবে। ১১-দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির সূত্রমতে, তারা এখন বিভাগ ও জেলা শহরে গণমিছিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং সেমিনারের বিষয় ও অতিথি নির্বাচনের কাজ করছে।
গণভোটের পটভূমি ও রাজনৈতিক সংকট
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি জুলাই সনদের সংবিধান-সংক্রান্ত ৪৮টি প্রস্তাব বাস্তবায়নে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, নির্বাচিত সদস্যদের দুটি শপথ নেওয়ার কথা ছিল—একটি সংসদ সদস্য হিসেবে এবং অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে।
তবে গত ১৭ ফেব্রুয়ারির শপথ অনুষ্ঠানে জামায়াত, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ বিরোধী দলের সদস্যরা দুটি শপথ নিলেও বিএনপির সদস্যরা দ্বিতীয় শপথ নেননি, ফলে এখনো সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হয়নি। জামায়াত নেতারা অভিযোগ করছেন যে, জুলাই সনদে স্বাক্ষর করলেও ক্ষমতায় গিয়ে বিএনপি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করছে, যা দেশে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকট তৈরি করছে।
বিএনপির পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, তারা জুলাই সনদের অধিকাংশ বিষয় বাস্তবায়ন করছে, তবে কিছু বিষয়ে তাদের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ ছিল, তাই সেসব বিষয় বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা তাদের নেই।
আন্দোলনের কৌশল ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১-দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ স্পষ্ট করেছেন যে, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত এই ধারাবাহিক কর্মসূচি চলমান থাকবে। সরকার যদি গণভোটের রায় মেনে না নেয়, তাহলে আরও কঠোর কর্মসূচির দিকে যাবে ১১ দল।
১১ দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সূত্রগুলো বলছে, তাদের প্রত্যাশা ছিল গণভোটের ফল অনুসারে দ্রুত সংস্কারের কাজ শুরু হবে, কিন্তু সময় গড়ালেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই, ফলে জনমনে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। এই অনিশ্চয়তা রাজনৈতিক কর্মসূচির পটভূমি হিসেবে কাজ করছে, এবং সরকারের ওপর ধীরে ধীরে রাজনৈতিক চাপ বাড়াতে চায় বিরোধী দল।
২ মের পরের কর্মসূচি নিয়ে ইতিমধ্যে একটি প্রাথমিক রূপরেখা তৈরি হয়েছে, এবং ১১ দলের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে কর্মসূচির দিনক্ষণ ঠিক হবে, যা আগামী সপ্তাহে হতে পারে। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সতর্ক করে বলেছেন যে, গণভোটের রায় বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত ১১ দল দফায় দফায় কর্মসূচি দেবে, এবং আন্দোলন দমনের চেষ্টা করলে তার ফল ভালো হবে না।
চ্যালেঞ্জ ও সামনের পথ
দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলনের ক্ষেত্রে ১১ দলের সামনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যেমন কর্মীদের সক্রিয় রাখা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং জনভোগান্তির প্রশ্ন। তাই পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনা করে দলগুলো ধাপে ধাপে এগোতে চায়, এবং কর্মসূচি দেওয়ার ক্ষেত্রে ঈদুল আজহা, এসএসসি-এইচএসসি পরীক্ষা, আবহাওয়াসহ দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করা হচ্ছে।
কর্মসূচির পরবর্তী ধাপগুলো শেষ হতে হতে বর্ষাকাল চলে আসবে, এবং এর মধ্যে জনস্বার্থসম্পর্কিত কোনো বিষয় এলে সেগুলো নিয়েও সরব থাকবে ১১ দল। সব মিলিয়ে কর্মসূচিগুলো শেষ করতে আগস্ট মাস শেষ হয়ে যাবে, তবে এর মধ্যেও দাবি আদায় না হলে সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর থেকে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার বিষয়ে নেতারা ভাবছেন।
দলগুলোর নেতারা মনে করেন, গণভোটের প্রশ্নে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলা প্রয়োজন, তাই ১১ দলের বাইরে আরও কিছু দলের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ চলছে। তাদের মতে, কর্মসূচি যত বিস্তৃত হবে, সরকারের ওপর চাপও তত বাড়বে। সংসদে প্রতিনিধিত্ব থাকা দলগুলো সেখানে বিষয়টি তুলবে, আর মাঠে শরিক দলগুলো কর্মসূচি চালাবে—এটি তাদের কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান (ইরান) বলেছেন, জনগণের ভোটের মূল্য দিচ্ছে না বিএনপি সরকার, তাই বিরোধী জোটের জনসমর্থন বাড়ছে। রাজনীতি-সংশ্লিষ্ট অনেকে মনে করেন, বিরোধী জোট কতটা শান্তিপূর্ণ, ধারাবাহিক এবং জনসম্পৃক্ততা বজায় রেখে আন্দোলন চালাতে পারে, তার ওপর সাফল্য নির্ভর করবে, এবং আগামী কয়েক সপ্তাহের রাজনৈতিক পরিস্থিতিই তাদের সামনের কর্মসূচির রূপ নির্ধারণ করবে।



