রুবেল হোসেনের বিদায়ী সাক্ষাৎকার: 'আমি পরিস্থিতির শিকার, সুযোগ পেলে আরও খেলতে পারতাম'
বাংলাদেশের সাবেক পেসার রুবেল হোসেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর নেওয়ার পর প্রথম আলোর সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তাঁর পুরো ক্যারিয়ার, সুযোগ না পাওয়ার বেদনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন। গত পাঁচ বছর জাতীয় দলে না খেলার পর হঠাৎ অবসরের এই সিদ্ধান্তের পেছনের কারণগুলো তিনি বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
অবসরের সিদ্ধান্ত ও বিদায়ী সংবর্ধনা
রুবেল হোসেন বলেন, 'আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বাদ পড়ার পরও আমি ভাবিনি যে আর জাতীয় দলে ফিরতে পারব না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারলাম, বয়সও তো হচ্ছে, হয়তো আর সুযোগ হবে না।' তিনি আরও যোগ করেন, 'প্রায় দেড় বছর ধরে ভাবছিলাম আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর ঘোষণা করব, কিন্তু এর জন্য একটি ভালো পরিবেশ দরকার ছিল। বিসিবির তখনকার অবস্থায় তা সম্ভব হচ্ছিল না।'
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অবসর ঘোষণার পর বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড দ্বিতীয় ওয়ানডের আগে মিরপুরে তাঁকে বিদায়ী সংবর্ধনা দেওয়া হয়। এই বিষয়ে রুবেল বলেন, 'অবসর ঘোষণার পর তামিম ইকবাল ভাই আমাকে ফোন দিয়ে বলেছিলেন, 'রুবেল, তুই তো অবসর ঘোষণা করলি ফেসবুকে, আমরা ক্রিকেট বোর্ড চাইছি তোকে সুন্দরভাবে সম্মানিত করার জন্য।' বিসিবি যেভাবে আমাকে বিদায় দিয়েছে, তা আমার খুব ভালো লেগেছে।'
মাঠে শেষ ম্যাচ না খেলার আফসোস
রুবেল স্বীকার করেন যে মাঠে একটি শেষ ম্যাচ খেলে বিদায় নিলে তাঁর বেশি ভালো লাগত। 'এটি স্বাভাবিক, মাঠে একটি ম্যাচ খেলে বিদায় নেওয়ার স্বপ্ন যেকোনো ক্রিকেটারেরই থাকে। সে রকম হলে আমি আরও বেশি খুশি হতাম,' বলেন তিনি। তবে তিনি আলহামদুলিল্লাহ বলে জানান, বিসিবি তাঁকে খুব সুন্দরভাবে সম্মানিত করেছে, যা তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে খুব খুশি করেছে।
বিদায়ী অনুষ্ঠান শেষে ছেলেকে নিয়ে মাঝমাঠে উইকেটের পাশে বসার সেই মুহূর্তটি ছিল অত্যন্ত আবেগঘন। রুবেল বলেন, 'তামিম ভাই-ই আমাকে বলেছেন, 'তুই একবার উইকেটে যা।' মিরপুরের এই মাঠ, উইকেট আমার জন্য আসলেই বিশেষ কিছু। অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট থেকে এই মাঠের সঙ্গে আমার সম্পর্ক। সে জন্যই আমি উইকেটটিকে সম্মান করেছি, চুমু খেয়েছি।'
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ও সুযোগ না পাওয়ার বেদনা
তিন সংস্করণ মিলিয়ে ১৯৩ উইকেটের মধ্যে ১২৯টি ওয়ানডেতে নেওয়া রুবেল তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। 'ওয়ানডেতে আমার ভালোই সাফল্য আছে, কিন্তু টেস্টে গড় খুবই খারাপ, যেটি নিয়ে আমি খুশি নই,' বলেন তিনি। রুবেল দাবি করেন, 'সুযোগ পেলে আমি ২০২৩ বা ২০২৪ সাল পর্যন্তও খেলতে পারতাম, ১০০ ভাগ পারতাম। শুধু শেষের দিকে নয়, মাঝখানেও কিছুদিন আমি খেলতে পারিনি।'
প্রায়ই আগের ম্যাচে ভালো বোলিং করেও পরের ম্যাচে টিম কম্বিনেশনের কারণে সুযোগ না পাওয়ার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে রুবেল বলেন, 'ওয়ানডেই আমার ফেবারিট ক্রিকেট। এটি হয়তো আমি আরও কিছুদিন খেলতে পারতাম; কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে টিম কম্বিনেশন, আবার কিছু সময় সিনিয়রদের কারণেও আমি খেলতে পারিনি। এই জায়গায় একটু কষ্ট লাগে।'
টেস্ট ক্রিকেট ও বাংলাদেশের পিচের চ্যালেঞ্জ
টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর খারাপ পারফরম্যান্সের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রুবেল বলেন, 'টেস্টে আমি অনেক বোলিং করলেও উইকেট পেতাম না। দিন শেষে টেস্টে উইকেটই কাউন্ট হয়।' তিনি আরও যোগ করেন, 'টেস্টে মিরপুর বা চট্টগ্রামের উইকেট ফ্লাট থাকে, স্পিন-সহায়ক উইকেট হয়। পেসারদের কিছু করার থাকে না। শুধু আমি নই, অন্য পেসারদেরও একই অবস্থা ছিল।'
মাশরাফির ছায়া ও ২০১৫ বিশ্বকাপের স্মৃতি
জাতীয় দলে ভুল সময়ে আসার অভিযোগ সম্পর্কে রুবেল বলেন, 'পারফর্ম করলে আপনাকে খেলাতে হবেই। মাশরাফি ভাই আমাদের সেরা বোলার ছিলেন তখন; কিন্তু তিনি তো ২০১১ বিশ্বকাপ খেলতে পারেননি। আমি খেলেছি, শফিউল খেলেছে।' ২০১৫ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অ্যাডিলেডের সেই ঐতিহাসিক ম্যাচটি তাঁর স্মরণীয় ম্যাচ হিসেবে উল্লেখ করেন রুবেল।
তিনি বলেন, 'এটি ছিল বিশ্বকাপের চ্যালেঞ্জিং ম্যাচ, জিতলেই কোয়ার্টার ফাইনাল, অনেক চাপ ছিল। সবকিছু মিলিয়ে এটিই আমার জীবনের সেরা ম্যাচ।' তবে নিদাহাস ট্রফির ফাইনাল ম্যাচটি তিনি ভুলে যেতে চান, যেখানে দিনেশ কার্তিকের ব্যাটিংয়ে ম্যাচটি হেরে যায় বাংলাদেশ।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও ক্রিকেটের সঙ্গে থাকার ইচ্ছা
ঘরোয়া ক্রিকেট নিয়ে রুবেল বলেন, 'প্রিমিয়ার লিগে খেলা নিয়ে কথাবার্তা চলছে। ভালো প্রস্তাব পেলে খেলব; আর খেললেও এক বছর বা সর্বোচ্চ দুই বছর, হয়তো এটিই শেষ বছর হয়ে যেতে পারে।' বর্তমানে মোটরবাইক ব্যবসায়ী রুবেল জানান, তাঁর ক্রিকেটের সঙ্গে থাকার ইচ্ছা আছে এবং তিনি মাঠের সঙ্গেই সম্পর্ক রাখতে চান।
সাক্ষাৎকারের শেষে রুবেল হোসেন বলেন, 'আল্লাহ-তায়ালা বিদায়ের সময় সুন্দর একটি সেলিব্রেশন করিয়েছেন, সম্মানিত করেছেন। আমিও চাই না এগুলো নিয়ে কিছু বলতে।' বাংলাদেশ ক্রিকেটের এই আক্রমণাত্মক পেসারের বিদায় নিঃসন্দেহে একটি যুগের সমাপ্তি নির্দেশ করছে।



