মোদিবিরোধী পোস্টের কারণেই গুম হওয়ার দাবি সাক্ষীর
জাতীয় ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তিন নম্বর সাক্ষী মাসরুর আনোয়ার চৌধুরী বুধবার জেরার সময় দাবি করেছেন, নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার কারণেই তাকে গুম করা হয়েছিল। র্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুম-নির্যাতনের এ মামলায় তার জেরা শেষ হয়েছে।
আসামিপক্ষের আইনজীবীদের জেরা
বুধবার ট্রাইব্যুনাল-১ এ আসামিপক্ষের আইনজীবীরা মাসরুর আনোয়ারকে জেরা করেন। রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন দাবি করেন, গুম-নির্যাতনের পেছনে শেখ হাসিনা দায়ী নন। তবে মাসরুর আনোয়ার সরাসরি এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে শেখ হাসিনাকেই দায়ী করেছেন।
জেরাকালে আইনজীবী তাবারক হোসেন প্রশ্ন তোলেন, বাংলাদেশে আগমন উপলক্ষ্যে ফেসবুকে নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে পোস্ট দেওয়ার কারণে তাকে আটক বা গুম করা হয়নি। জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণেই আটক করা হয়েছে। জবাবে মাসরুর বলেন, "মোদিবিরোধী পোস্ট দেওয়ার কারণেই আমাকে আটক করা হয়। জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।"
ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ও পাসওয়ার্ড বাজেয়াপ্ত
আটকের পর মোদিবিরোধী পোস্টটি দেখানো হয়েছিল কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে মাসরুর জানান, নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে মোদিবিরোধী পোস্টটি তাকে দেখানো হয়। তবে মুছে ফেলতে বলা হয়নি এবং নিজেও তা সরিয়ে নেননি। তবে ফেসবুক অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ডসহ সবকিছু তারা নিয়ে নেন, যা আর ফেরত দেওয়া হয়নি।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মসজিদ নির্মাণ প্রসঙ্গ
জেরার এক পর্যায়ে আইনজীবী তাবারক হোসেন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মসজিদ তৈরির অর্থ সংগ্রহের তথ্য জানতে চান। তিনি দাবি করেন, চ্যারিটির কার্যক্রমের আড়ালে জঙ্গি-তৎপরতা চালানো হয়েছে। প্রত্যুত্তরে মাসরুর বলেন, "আমার সহকর্মী, বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে মসজিদ তৈরি করি। এ কাজের আড়ালে অন্য কোনো তৎপরতা চালানো হয়নি।"
মুক্তি পরিষদ ও জিয়াউল হক প্রসঙ্গ
তাবারক হোসেন আরও দাবি করেন, মাসরুর মেজর সৈয়দ জিয়াউল হকের ‘মুক্তি পরিষদ’ নামে সংগঠনের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তি। অথচ জঙ্গি কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে জিয়াউল হককে বরখাস্ত করা হয়েছিল। জবাবে মাসরুর বলেন, মুক্তি পরিষদের কোনো কার্যক্রমের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা নেই এবং কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে জিয়াউল হককে বরখাস্তের খবরটিও তার জানা নেই।
শেখ হাসিনার দায়িত্ব প্রসঙ্গ
পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হয়ে মাসরুরকে জেরা করেন আমির হোসেন। তিনি দাবি করেন, মাসরুরের গুম-নির্যাতন ও ক্যারিয়ার নষ্টের জন্য শেখ হাসিনা দায়ী নন। ক্যারিয়ার নষ্টের জন্য সাক্ষী নিজেই দায়ী এবং ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের হওয়ায় সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অসত্য সাক্ষ্য দিয়েছেন।
জবাবে মাসরুর স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "গুম-নির্যাতন ও আমার ক্যারিয়ার নষ্ট করার জন্য শেখ হাসিনা-ই দায়ী। কোনোভাবেই আমি দায়ী নই। ট্রাইব্যুনালে অসত্য কোনো সাক্ষ্য দেইনি।"
গ্রেফতার ও পলাতক আসামিরা
এ মামলায় বর্তমানে গ্রেফতার ১০ জনকে ঢাকার সেনানিবাসের সাব-জেল থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে। গ্রেফতারদের মধ্যে রয়েছেন:
- র্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম
- ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার
- ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কামরুল হাসান
- ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহাবুব আলম
- কর্নেল কেএম আজাদ
- কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন
- কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান (অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে)
- র্যাবের গোয়েন্দা শাখার সাবেক পরিচালক কর্নেল মশিউর রহমান
- লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম সুমন
- লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেম
শেখ হাসিনা ছাড়া পলাতক অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন:
- শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষাবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক
- সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল
- সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ
- র্যাবের সাবেক ডিজি এম খুরশীদ হোসেন
- র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক ব্যারিস্টার হারুন অর রশিদ
- র্যাবের সাবেক পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) খাইরুল ইসলাম
পরবর্তী কার্যক্রম
ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেল পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ৪ মে দিন ধার্য করেছেন। প্যানেলের অন্য সদস্য হলেন বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ।
এদিকে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নরসিংদীতে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলে আরও দুই মাস সময় বাড়ানো হয়েছে। আগামী ২২ জুন প্রতিবেদন জমার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও গাজী এমএইচ তামিম। তাদের সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর শাইখ মাহদী, তাসমিরুল ইসলাম উদয়সহ অন্যরা।



