সিরাজগঞ্জের কামারখন্দে ইমামের পালিয়ে যাওয়া: দুই সন্তানের জননীকে নিয়ে উধাও
সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলায় একটি মর্মান্তিক ঘটনায় স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম দুই সন্তানের জননীকে নিয়ে উধাও হয়ে গেছেন। বুধবার (২২ এপ্রিল) এই বিষয়টি এলাকাবাসীর মাঝে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। তবে বাস্তবে ঘটনাটি গত ১৩ এপ্রিল উপজেলার বাঁশবাড়িয়া গ্রামে সংঘটিত হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
ইমাম ও নারীর মধ্যে প্রেমের সম্পর্কের ইতিহাস
এলাকাবাসী ও সংশ্লিষ্ট পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা যায়, বাশঁবাড়িয়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের ইমামতির দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি হাফেজ ইমরান হোসেন নূরী (৩৭) একই গ্রামে ‘মিফতাহুল উলুম কওমিয়া হাফিজিয়া ক্যাডেট মাদ্রাসা’ নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। ইমরানের নিজের তিন কন্যা ও এক পুত্র সন্তান রয়েছে।
মাদ্রাসার নিকটবর্তী রানা সেখের বাড়িতে তার স্ত্রী ইসমত আরা (৩৮) ও ছেলেকে নিয়ে বসবাস করতেন। তাদের একটি কন্যা সন্তান আছে, যার বিয়ে হয়ে গেছে। মাদ্রাসায় যাতায়াতের সুবাদে ইমরান প্রায়ই রানা সেখের বাড়িতে সময় কাটাতেন এবং ইসমত আরাকে শাশুড়ি বলে সম্বোধন করতেন।
এক পর্যায়ে ইমাম ইমরান ও ইসমত আরার মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। প্রায় তিন বছর ধরে প্রতিবেশী ও স্থানীয়রা ইমরানকে বারবার রানা সেখের বাড়িতে যেতে নিষেধ করলেও তিনি তাদের বারণ মানেননি।
ঘটনার চূড়ান্ত পর্যায় ও পালিয়ে যাওয়া
পরিস্থিতি আরও জটিল হয় যখন মাস দেড়েক আগে ঋণগ্রস্ত হয়ে রানা সেখ তার স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে গাজীপুরে চলে যান। এরপর ইসমত আরার সঙ্গে যোগসাজশে ইমরানও গাজীপুরের মৌচাকে পাড়ি জমান। সেখানে একটি ভাড়া বাসায় ১০ এপ্রিল রাতে ইসমত আরা ও ইমরানকে অন্তরঙ্গ মুহূর্তে ধরে ফেলেন রানা সেখ।
মানসম্মানের ভয়ে ইমরানকে ছেড়ে দিয়ে রানা সেখ ইসমত আরাকে তার বাবার বাড়ি সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার সয়দাবাদের মোহনপুর এলাকায় রেখে যান। কিন্তু সর্বশেষ গত ১৩ এপ্রিল রাতে বাবার বাড়ি থেকে দুই সন্তানের জননী ইসমত আরাকে নিয়ে চার সন্তানের জনক হাফেজ ইমরান হোসেন নূরী পালিয়ে যান। সেই থেকে তাদের আর কোনো খোঁজ মেলেনি।
পরিবারের দুর্দশা ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া
ইমরানের বাবা দুলাল সেখ তার ছেলের খোঁজ না পেয়ে চার নাতি ও পুত্রবধূকে নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। বুধবার দুপুরে ইমরানের বাড়িতে গেলে কান্নায় ভেঙে পড়েন এই বৃদ্ধ ব্যক্তি। তিনি বলেন, ‘ছেলেকে অনেক কষ্টে হাফেজ বানিয়েছি। এলাকায় তার বেশ সুনাম ছিল। কিন্তু ছেলে যে এমন কাজ করতে পারে, ভাবতেই পারিনি। মানসম্মান সব শেষ হয়ে গেছে।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘তার স্ত্রী, ছোট ছোট তিনটি কন্যা ও একটি পুত্র সন্তান রয়েছে। আমি বৃদ্ধ মানুষ, কোনো আয় রোজগার করতে পারি না। তাদের ভরণপোষণ কীভাবে করবো, সেই চিন্তায় আমি দিনে দিনে অসুস্থ হয়ে পড়ছি।’
রানা সেখের বাড়িতে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি, তবে ইসমত আরার জা ফুলু মালার সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, ‘আমরা বিষয়টি টের পেয়ে ইসমত আরাকে অনেক বুঝিয়েছি এবং হুজুরকে ইসমত আরার বাড়িতে আসতে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু তারা কেউ মানেনি।’
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল মোমিন মন্ডল বলেন, ‘ইমাম ইমরান ইসমত আরাকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ায় গ্রামের মানসম্মান সব নষ্ট হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, মাদ্রাসার প্রায় আড়াই লাখ টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছে ইমরান। তাদের কোনো খোঁজখবরই পাচ্ছি না।’
প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপের অবস্থা
এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ইমরান হোসেন নূরীর মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। রায়দৌলতপুর ইউনিয়নের বাঁশবাড়িয়া গ্রামের ইউপি সদস্য আখিরুল ইসলাম বলেন, ‘ঘটনাটি আমি শুনেছি। কিন্তু কোনো পক্ষ আমার কাছে আসেনি। তাই সামাজিকভাবে মীমাংসার চেষ্টাও করিনি।’
কামারখন্দ থানার ওসি হাশমত আলী জানান, ‘এ ব্যাপারে থানায় কেউ আসেনি। যদি কেউ লিখিত অভিযোগ দেয়, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ এই ঘটনায় এলাকায় সামাজিক অস্থিরতা ও নৈতিকতার প্রশ্নে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।



