পল্লবীতে শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যায় দেশজুড়ে শোক ও প্রতিবাদ
পল্লবীতে শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যায় শোক ও প্রতিবাদ

রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শোকে স্তব্ধ পুরো দেশ। গভীর শোক নেমে এসেছে রামিসার পরিবার, শিক্ষক ও সহপাঠীদের মাঝে। ফুটফুটে মেয়েটিকে হারিয়ে মা-বাবার আহাজারি কিছুতেই থামছে না। মেয়ের স্মৃতিতে ভরা শ্রেণিকক্ষে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা।

শ্রেণিকক্ষে বাবার কান্না

বৃহস্পতিবার (২১ মে) সকালে রাজধানীর মিরপুরের পপুলার মডেল স্কুলে মেয়ের শ্রেণিকক্ষে যান রামিসার বাবা। রামিসা এই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। পড়াশোনায় অত্যন্ত মেধাবী রামিসার রোল নম্বর ছিল এক। প্লে ও কেজিতে দ্বিতীয় স্থান অর্জনের পর প্রথম শ্রেণিতে সে প্রথম হয়েছিল। শ্রেণিকক্ষে ঢুকেই ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের দেখে নিজেকে আর সামলাতে পারেননি রামিসার বাবা। সহপাঠীদের জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদতে থাকেন তিনি। তার কান্নায় পুরো শ্রেণিকক্ষে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

সহপাঠীদের কান্না ও প্রতিবাদ

কান্নাজড়িত কণ্ঠে রামিসার সহপাঠীরা বলে, “রামিসাকে কখনও ভোলা যাবে না।” তারা হত্যাকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে বলে, “খুনির যেন কোনোভাবেই ছাড় না হয়।” রামিসা হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে স্কুলের শিক্ষক ও সহপাঠীরা পল্লবী এলাকায় ‘রামিসা হত্যার বিচার চাই’ লেখা ব্যানার নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাবার বেদনাভরা বক্তব্য

কান্নাজড়িত কণ্ঠে রামিসার বাবা বলেন, “আমার একটা হৃদপিণ্ড ছিল রামিসা, সেটাই আল্লাহ নিয়ে গেছে। গত পরশুদিন ও বললো— বাবা, আমাকে একটা বোরকা কিনে দাও। আমার চাচাতো ভাই বললো ইসলামপুর থেকে তিন থেকে চারশ’ টাকায় পাওয়া যাবে। কিন্তু আমি সেখান থেকে না কিনে ইউনিয়ন মার্কেট থেকে এক হাজার টাকা দিয়ে মেয়েকে বোরকা এনে দিয়েছি। আমার পরনের স্যান্ডেলটা তিন বছরের পুরোনো, ছেঁড়া। সেলাই করে পরি, তাও পাল্টাই না। কিন্তু আমার বাচ্চাদের আমি কখনও কষ্ট পেতে দেই না। মোবাইলে আমার মেয়ের অন্তত ৫০০ ছবি আছে, কিন্তু এখনও আমার সাহস হয়নি মেয়ের একটা ছবি বের করে দেখার। আমি দরিদ্র, ভাঙা বাসায় থাকি, কিন্তু আমার সন্তানদের কখনও দারিদ্র্যের স্বাদ পেতে দেইনি।”

শিক্ষকের বক্তব্য

রামিসার ক্লাস টিচার মাহবুবুল হাকিম বলেন, “প্রথম শ্রেণির ক্লাস সকাল ১১টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত চলে। রামিসা সবসময়ই ১০ মিনিট আগে স্কুলে চলে আসতো। সেদিন (মঙ্গলবার) না আসায় চিন্তায় ছিলাম। পরে শুনি তাকে হত্যা করা হয়েছে।” এই ধরনের ঘটনা মেনে নেওয়ার মতো নয় বলেও জানান তিনি।

মায়ের বর্ণনায় ভয়াবহ মুহূর্ত

নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সেই ভয়াবহ মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্না জড়িত কণ্ঠে রামিসার মা পারভীন আক্তার বলেন, “আমি একটা চিৎকার শুনেছিলাম, কিন্তু বুঝতে পারিনি সেটা আমার মেয়ের ছিল।” তিনি জানান, সেদিন সকালে রামিসাকে স্কুলে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছিল। তাকে দাঁত ব্রাশ করে স্কুল ড্রেস পরতে বলে রামিসা পাশের রুমে যায়। ওই সময় রামিসার ১০ বছর বয়সী বড় বোন রাইসা পাশের বাসায় চাচার বাড়ি যাচ্ছিল। রামিসাও সঙ্গে যেতে চাইলে রাইসা তাকে ঘরে থাকতে বলে বের হয়ে যায়। পরিবারের ধারণা, দরজা খোলার সুযোগে ওঁত পেতে থাকা খুনি রামিসাকে টেনে ভেতরে নিয়ে যায়।

পারভীন আক্তার বলেন, “কিছুক্ষণ পর একটি চিৎকার শুনলেও ভেবেছিলাম পাশের ফ্ল্যাটের অন্য কোনও শিশুর শব্দ। ভেবেছি ও বড় বোনের সঙ্গেই গেছে। কিন্তু বড় মেয়েকে একা ফিরতে দেখে আমার সন্দেহ হয়। খোঁজাখুঁজি শুরু করে দরজায় ধাক্কা দেই। সব ফ্ল্যাটের দরজা খুললেও ওই ঘরের দরজা খোলেনি।” হত্যার পেছনে কোনও শত্রুতা ছিল কিনা জানতে চাইলে মা বলেন, “কোনও কারণ ছিল না, কেবল লালসা। আমার মেয়ে মাত্র দরজা খুলেছিল। একটা জুতো পরেছিল, অন্যটা পরারও সুযোগ পায়নি। টান দিয়ে নিয়ে গেছে। দরজার বাইরে একটা জুতো পড়ে থাকতে দেখেই সন্দেহ হয়। পরে লোকজন এসে দরজা ভেঙেছে। পেছনের বাড়ির মানুষ খুনিকে ওই দিক দিয়ে পালিয়ে যেতে দেখেছে।”

বড় বোনের বক্তব্য

রামিসার বড় বোন রাইসা বলে, “বোন আমার পিছে পিছে বের হলেও আমি লক্ষ্য করিনি। দরজার বাইরে থেকেই লোকটা ওকে টান দিয়ে নিয়ে যায়। ও চিৎকার করেছিল, আম্মু সেই শব্দ শুনেছিল।”

ঘরে শুধু ট্রফি, নিরাপত্তার দাবি

রামিসাদের ঘরে এখন কেবল শোভা পাচ্ছে তার ভালো ফলাফলের জন্য স্কুল থেকে পাওয়া নানামুখী ট্রফিগুলো। কিন্তু যার ট্রফি, সেই রামিসা আর নেই। বড় বোন রাইসা বারবার ট্রফিগুলোর দিকে তাকাচ্ছিল আর বলছিল, “আমার বোন অনেক ভালো ছাত্রী ছিল, পড়াশোনায় খুব মনোযোগ ছিল ওর।”

সর্বত্র প্রতিবাদ

এদিকে এই নৃশংস ঘটনার প্রতিবাদে এবং দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবিতে রাজপথে নেমেছেন নানা শ্রেণিপেশার মানুষ। বৃহস্পতিবার সকালে পল্লবীতে রামিসার বাসার সামনে বিক্ষোভের পর এলাকাবাসী ক্ষোভে ফেটে পড়ে পল্লবী থানার ভেতরে ঢুকে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। এলাকাবাসী নিজেদের সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ঘরে-বাইরে কোথাও এখন শিশুদের নিরাপত্তা নেই। তারা এই নির্মমতার দ্রুত ও কঠোরতম শাস্তি দাবি করেন। শুধু রাজধানীই নয়, এই ঘটনার প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন জেলাতেও মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ হচ্ছে। রামিসার গ্রামের বাড়ি শেরপুরে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘আজকের তারুণ্য’-এর ব্যানারে অভিযুক্তের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ করা হয়েছে।

ঘটনার বিবরণ

গত মঙ্গলবার (১৯ মে) সকালে মিরপুরের পল্লবীর একটি ফ্ল্যাটের খাটের নিচ থেকে রামিসার মস্তকবিহীন দেহ এবং পরে বাথরুম থেকে খণ্ডিত মাথা উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। পুলিশ প্রথমে প্রধান আসামি সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে আটক করে। পরবর্তীকালে মূল অভিযুক্ত সোহেল রানাকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর, শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার কথা স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে ঘাতক সোহেল রানা।