অ্যাকসেসিবিলিটি: প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য এখনও বড় চ্যালেঞ্জ
অ্যাকসেসিবিলিটি: প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য এখনও বড় চ্যালেঞ্জ

অ্যাকসেসিবিলিটি নিয়ে বহুদিন ধরেই আলোচনা চলছে, তবে ২০০৬ সালে জাতিসংঘে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সনদ অনুমোদনের পর বিষয়টি গুরুত্ব পেতে শুরু করে। সেই সনদের ভিত্তিতেই বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ প্রণয়ন করা হয়েছে। দেশে বিল্ডিং কোডও রয়েছে, যা একটি ভবন কীভাবে নির্মিত হবে তার নীতিমালা নির্ধারণ করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অ্যাকসেসিবিলিটিকে এতটাই এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে যে এখন এই অবস্থা থেকে ফিরে আসা কীভাবে সম্ভব, তা নিয়ে বড় ধরনের দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে। শুধু পাবলিক অবকাঠামো নয়, সরকারি অবকাঠামোর বড় অংশই এখনও পুরোপুরি ইনঅ্যাকসেসিবল।

ভুল ধারণা ও বাস্তবতা

আমাদের দেশে হাস্যকর এক ধরনের ধারণা প্রচলিত আছে। অনেকে মনে করেন, ভবনের ভেতরে লিফট থাকলেই মানুষ ওপরে উঠতে পারবে। কিন্তু লিফটে পৌঁছানোর আগের সিঁড়িগুলোর অবস্থাই এমন যে একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সেখানে পৌঁছাতে পারবেন না। আমি নিজে হুইলচেয়ার ব্যবহার করি। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হলো, বাসা থেকে বের হতে গেলেই আমার দুই জন মানুষের প্রয়োজন হয়। তা না হলে হুইলচেয়ারে করে কোথাও যাওয়া সম্ভব হয় না। অথচ দুই জন মানুষ সবসময় পাওয়া যেমন কঠিন, তেমনি ব্যয়বহুলও। অফিসে দায়িত্ব থাকলে কোনোভাবে সহায়তা পাওয়া যায়, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে তো কেউ থাকে না।

এই বাস্তবতায় আমার জন্য পৃথিবীটা খুব ছোট হয়ে গেছে। আমি আত্মীয়স্বজনের বাসায় যেতে পারি না, বিয়ের অনুষ্ঠানে যেতে পারি না, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও অংশ নিতে পারি না। মহিলা সমিতিতে গিয়ে নাটক দেখা—যেটা আগে করতাম—এখন সেটাও সম্ভব হয় না। পুরো জীবনটাই যেন খুব ছোট্ট এক পরিসরে আটকে গেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সরকারি উদ্যোগ ও চ্যালেঞ্জ

এত কথা বলার পরও আমি বাস্তবে খুব বেশি অ্যাকশন দেখি না। বর্তমান সরকারকে ছোট করে দেখতে চাই না। তারা উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু সেই উদ্যোগ বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, তার কোনো স্পষ্ট রূপরেখা আমি দেখি না। কারণ বাংলাদেশের অধিকাংশ হোটেল-রেস্তোরাঁ এমনভাবে নির্মিত যে সেখানে অ্যাকসেসিবিলিটি নিশ্চিত করাই কঠিন। ওয়াশরুম বা বাথরুমও ব্যবহার উপযোগী নয়। তবু চেষ্টা করা উচিত। আমি হতাশ নই, বরং আশাবাদী মানুষ হিসেবেই কথাগুলো বলছি।

অদৃশ্য প্রতিবন্ধী গোষ্ঠী

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমরা অ্যাকসেসিবিলিটি বলতে শুধু শারীরিক প্রবেশাধিকার বুঝি। অর্থাৎ হুইলচেয়ার নিয়ে ঢোকা যাবে কিনা, সেটাই দেখি। কিন্তু একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি রেস্তোরাঁয় গিয়ে নিজে কি মেন্যু দেখতে পারবেন? সেটি কি ব্রেইলে লেখা আছে? না, নেই। কেউ সেটি নিয়ে ভাবেইনি। আবার একজন শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি, কিংবা যাদের আমরা ডেফ-ব্লাইন্ড গ্রুপ বলি, তারা রেস্তোরাঁয় গিয়ে কার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন? তাদের ভাষা বুঝবে কে? ফলে এই মানুষগুলো সবসময় বাদ পড়ে যায়। অথচ তাদের সংখ্যা কম নয়, বরং হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের চেয়েও বেশি। কিন্তু তারা অদৃশ্য, আমরা তাদের দেখি না। সরকারকে এ বিষয়টিও মনে রাখতে হবে, কীভাবে তাদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা যায়।

অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও শিক্ষা

আরেকটি প্রশ্ন হচ্ছে অর্থনৈতিক সক্ষমতা। রেস্তোরাঁয় যেতে তো টাকা লাগে। কয়জন প্রতিবন্ধী মানুষের আয় আছে? অনেকেই লেখাপড়া করে ঘরে বসে আছেন। অ্যাকসেসিবিলিটির অভাবে তারা চাকরি পাচ্ছেন না। আবার চাকরি করতে গেলে তো শিক্ষার প্রয়োজন। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোই যদি ইনঅ্যাকসেসিবল হয়, তাহলে পড়াশোনা করবে কীভাবে? বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় অংশই এখনও প্রবেশযোগ্য নয়। প্রফেশনাল ট্রেনিং সেন্টারগুলোর অবস্থাও একই। সেগুলো যদি ইনঅ্যাকসেসিবল হয়, তাহলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা প্রশিক্ষণ নেবেন কীভাবে? শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ছাড়া কর্মসংস্থান সম্ভব নয়। আর কর্মসংস্থান না থাকলে আয়ও থাকবে না। তখন রেস্তোরাঁয় যাওয়া তো অনেক পরের বিষয়।

সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা

তারপরও আমি মনে করি, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তবে শুধু হোটেল-রেস্তোরাঁ নয়, সব অবকাঠামোকেই অ্যাকসেসিবল করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রফেশনাল ট্রেনিং সেন্টারগুলোও অ্যাকসেসিবল হওয়া জরুরি। যেন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন, দক্ষতা অর্জন করতে পারেন, কর্মসংস্থানের সুযোগ পান এবং নিজেদের উপার্জনের টাকায় স্বাভাবিক জীবনের অংশ হতে পারেন। আমি আসলে বলতে চাইছি, শুধু ফ্যান্সি কথাবার্তা বলে লাভ নেই, যদি প্রতিবন্ধী মানুষের মূল সমস্যাগুলোই অমীমাংসিত থাকে। রেস্তোরাঁয় কয়জন প্রতিবন্ধী মানুষ যেতে পারেন? আমার নিজেরই তো সমস্যা হয়। আমার টাকা থাকতে পারে, কিন্তু একা কোথাও উঠতে না পারলে রেস্তোরাঁয় যাওয়াটাই ব্যয়বহুল হয়ে যায়। কারণ সঙ্গে দুই জন মানুষ লাগে। আর যাদের আয়ই নেই, তারা তো রেস্তোরাঁয় যাওয়ার কথাই ভাববেন না। সেই জায়গায় সরকারের ভূমিকা কী হবে, সেটাই এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন।

লেখক: নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর সার্ভিসেস অ্যান্ড ইনফরমেশন অন ডিজ-অ্যাবিলিটি (সিএসআইডি)