মমতার পদত্যাগ না করার ঘোষণা রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করেছে
মমতার পদত্যাগ না করার ঘোষণায় উত্তেজনা

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির কাছে তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয়ের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদত্যাগ করবেন না’ বলে দেওয়া ঘোষণা রাজ্যে এক নতুন রাজনৈতিক উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে। নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ২০৭টি আসনে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে, যেখানে তৃণমূল কংগ্রেস মাত্র ৮০টি আসন পেয়ে অনেক ব্যবধানে দ্বিতীয় স্থানে নেমে এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনি ফলাফল ছাপিয়ে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে রাজ্যে নতুন সরকার গঠন প্রক্রিয়া। এই সংকটের মূলে একটি সাধারণ প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, জনমত হারানোর পরও কি একজন মুখ্যমন্ত্রী তার পদে বহাল থাকতে পারেন?

কী বলেছেন মমতা?

নির্বাচনে কারচুপি ও জোর করে ক্ষমতা দখলের অভিযোগ তুলে পদত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মঙ্গলবার তৃণমূল কংগ্রেসের এই সভানেত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, পদত্যাগের কোনও প্রশ্নই ওঠে না। তিনি বলেন, ‘পদত্যাগের কোনও প্রশ্নই নেই। আমি পদত্যাগ করব না।’ নির্বাচনে হারের বিষয়টি মেনে নিতে নারাজ মমতা দাবি করেন, এই ফলাফল প্রকৃত জনরায় নয়, বরং একটি ‘চক্রান্ত’। মমতা বলেন, ‘আমি পদত্যাগ করব না। আমরা হারিনি। আমাদের হারানোর চেষ্টা করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে অফিশিয়ালি তারা আমাদের হারাতে পারে, কিন্তু নৈতিকভাবে আমরাই জিতেছি।’ রাজভবনে গিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেবেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে মমতা সরাসরি বলেন, ‘কেন যাব? কী উদ্দেশ্যে? আমরা তো হারিনি যে পদত্যাগ করতে যাব। যদি হারতাম, তবে পদত্যাগপত্র জমা দিতাম। এখন সেই প্রশ্নই ওঠে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘জোর করে ক্ষমতা দখল করলেই কেউ তাকে পদত্যাগ করাতে পারবে না। পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেন, আমার দল এই সিদ্ধান্ত নেবে। আমি একা নই, দল আমার সঙ্গে আছে। আমরা সবাই মিলে পরবর্তী কৌশল ঠিক করব।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সংবিধানে যা আছে

ভারতের সাংবিধানিক কাঠামোতে এ বিষয়ে অস্পষ্টতার কোনও অবকাশ নেই। একজন মুখ্যমন্ত্রী ততক্ষণই তার পদে থাকতে পারেন, যতক্ষণ বিধানসভায় তার প্রতি সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থা থাকে। সংসদীয় গণতন্ত্রের এই মূল নীতি অনুযায়ী, বিধানসভার ভেতরের সংখ্যাই নির্ধারণ করে কে শাসন করবেন; বাইরে কে কী রাজনৈতিক দাবি করলেন, সেটির কোনও গুরুত্ব নেই। ব্যবহারিক অর্থে, যখন নির্বাচনের ফলাফল অন্য কোনও দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করে, তখন বিদায়ী সরকার তার শাসন করার নৈতিক ও আইনগত কর্তৃত্ব হারায়। এমনকি যদি তারা আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ না-ও করে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাজ্যপালের ভূমিকা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ

এমন পরিস্থিতিতে সব নজর এখন রাজ্যপালের ওপর। রাজ্যপাল এখানে সাংবিধানিক রেফারি হিসেবে কাজ করেন এবং এটি নিশ্চিত করেন যেন সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থনপুষ্ট একটি সরকার ক্ষমতায় থাকে। সাধারণত এর পর তিনটি পদক্ষেপ অনুসরণ করা হয়। প্রথমত, বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বলা হতে পারে। দ্বিতীয়ত, যদি কোনও অনিশ্চয়তা থাকে, তবে বিধানসভায় ফ্লোর টেস্ট বা শক্তি পরীক্ষার নির্দেশ দেওয়া হতে পারে এবং তৃতীয়ত, সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাকে নতুন সরকার গঠনের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। যদি বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী পদত্যাগ করতে অস্বীকার করেন, তবে রাজ্যপাল বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রমাণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নিতে পারেন।

যদি মুখ্যমন্ত্রী পদত্যাগ করতে রাজি না হন?

বিজেপির কাছে বড় ব্যবধানে হারের পরও মমতার এই অনড় অবস্থান রাজ্য রাজনীতিতে জটিলতা তৈরি করেছে। নিয়ম অনুযায়ী, মুখ্যমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয় এবং নতুন সরকার শপথ না নেওয়া পর্যন্ত তিনি অন্তর্বর্তীকালীন বা ‘কেয়ারটেকার’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে বিজেপি সরকার গঠনের দাবি জানাবে এবং রাজ্যপাল তাদের নেতাকে শপথ গ্রহণের আমন্ত্রণ জানাবেন। মমতা পদত্যাগ না করলেও এই প্রক্রিয়ায় আইনি বাধা দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জানিয়েছেন, মমতার এই জেদ কোনো পরিবর্তন আনবে না। কারণ পাঁচ বছরের ম্যান্ডেট বা মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় রাজ্যপাল বিধানসভা ভেঙে দিতে পারেন এবং সরকারের মেয়াদও স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যাবে। পদত্যাগ করতে অস্বীকার করলেও তাতে সাংবিধানিক অবস্থানের কোনও পরিবর্তন হয় না। যদি মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে না পারেন, তবে তার পদে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এমন অবস্থায়, একটি আস্থা ভোট অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে সদস্য সংখ্যা গণনা করা হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণে ব্যর্থ হওয়া মানেই সরকারের মেয়াদের কার্যকর অবসান। রাজ্যপাল তখন মন্ত্রিসভা ভেঙে দিতে পারেন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ দলকে ক্ষমতা গ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানাতে পারেন। সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমর্থন ছাড়া কোনও নেতার মুখ্যমন্ত্রী পদে থাকার কোনও সাংবিধানিক পথ খোলা নেই। বর্তমান বিধানসভাটি আগামী কয়েকদিনের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এতে তৃণমূলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। কিন্তু নতুন নির্বাচিত বিধানসভায় তৃণমূল বৃহত্তম দল নয়। ফলে রাজ্যপাল নতুন বিধানসভায় একক বৃহত্তম দলের নেতাকে সরকার গঠন বা সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের জন্য ডাকতে বাধ্য নন।

পরাজয়ের পর কি পদত্যাগ বাধ্যতামূলক?

ভারতের সংবিধানে সুনির্দিষ্টভাবে বলা নেই যে পরাজয়ের পরপরই মুখ্যমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে। তবে ‘সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকার’ আবশ্যিক শর্তটি বাস্তবে পদত্যাগকে অনিবার্য করে তোলে। তাই পদত্যাগ কেবল একটি রাজনৈতিক রীতি বা প্রথা নয়, বরং বিধানসভার সমর্থন হারানোর এটি একটি স্বাভাবিক পরিণতি।

অতীতের নজির

ভারতে বিভিন্ন রাজ্যে এবং রাজনৈতিক দলে নির্বাচনের পর একাধিকবার ক্ষমতার হস্তান্তর হয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই ফলাফল স্পষ্ট হওয়ার পর বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীরা সরে দাঁড়িয়েছেন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ দলকে সরকার গঠনের সুযোগ করে দিয়েছেন। এমনকি কদাচিৎ কোনও বিরোধ বা বিলম্বের ঘটনা ঘটলেও আদালত সবসময় একটি নীতিই বহাল রেখেছে, সংখ্যাগরিষ্ঠতা অবশ্যই বিধানসভার মেঝেতে যাচাই করতে হবে। সংখ্যাতত্ত্বে স্পষ্ট ব্যবধানে হারার পর কোনও নেতাই ক্ষমতা ধরে রাখতে পারেননি।

পশ্চিমবঙ্গের পরবর্তী ধাপ

বিজেপির পক্ষে এই জনমতের পর সামনের পথটি মূলত পদ্ধতিগত। রাজ্যপাল খুব শিগগির সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। বিজেপি বিধায়ক দল তাদের নেতা নির্বাচন করবে। নতুন নেতাকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হবে। যদি বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী তার অবস্থানে অনড় থাকেন, তবে বিষয়টি দ্রুত নতুন বিধানসভার সদস্যদের মাধ্যমে ফ্লোর টেস্টে পৌঁছাবে অথবা সরাসরি সাংবিধানিক হস্তক্ষেপের দিকে মোড় নেবে।

সূত্র: ইকনোমিক টাইমস