লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়েছে দেড় মাস আগেই। তবু থেমে নেই আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সগুলোর টিকিট বিক্রি, কার্গো বুকিং কিংবা বৈদেশিক লেনদেন। বাংলাদেশে কার্যক্রম চালানো অন্তত ১৬টি আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সের স্থানীয় জেনারেল সেলস এজেন্ট (জিএসএ) এখনও বহাল তবিয়তে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে, যদিও তাদের লাইসেন্স নবায়ন হয়নি।
আইন লঙ্ঘন ও ঝুঁকি
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে একদিকে যেমন আইন লঙ্ঘিত হচ্ছে; অপরদিকে যাত্রী সুরক্ষা, আর্থিক জবাবদিহি এবং সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাপনাও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে সৌদি অ্যারাবিয়ান এয়ারলাইন্সের জিএসএ ইউনাইটেড লিঙ্ক লিমিটেড, কাতার এয়ারওয়েজের ওরিক্স এভিয়েশন লিমিটেড, ইতিহাদ এয়ারওয়েজের উইং এভিয়েশন লিমিটেড, ইন্ডিগো ও এয়ার অ্যারাবিয়ার এজেন্ট আরএএস হলিডেজ ও ওয়ান ওয়ার্ল্ড এভিয়েশন। এছাড়া ক্যাথে প্যাসিফিক ও মালিন্দো (বাটিক এয়ার) এয়ারলাইন্সের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছে গ্লোবাল এভিয়েশন ও প্রাইম এভিয়েশন লিমিটেড।
বেবিচকের অন্তর্বর্তী আদেশ
জানা গেছে, বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) গত ১৭ ফেব্রুয়ারি এক আদেশে এসব জিএসএর অনুমতির মেয়াদ সাময়িকভাবে বাড়িয়েছিল। ওই আদেশে বলা হয়েছিল, এটি কেবল অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা এবং সর্বোচ্চ ৩১ মার্চ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। কিন্তু সেই সময়সীমা পেরিয়ে প্রায় দেড় মাস হলেও লাইসেন্স নবায়নের কোনও উদ্যোগ দেখা যায়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান সময়মতো প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও ফি জমা দিলেও রহস্যজনক কারণে তাদের আবেদন ঝুলে আছে।
বেবিচকের বক্তব্য
বেবিচকের সদস্য এয়ার কমডোর মুকিত উল আলম মিয়া বলেন, “কিছু প্রশাসনিক জটিলতার কারণে লাইসেন্স নবায়ন প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হচ্ছে। তবে বিষয়টি দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আশা করছি, শিগগিরই এই জটিলতা কেটে যাবে।” তবে এভিয়েশন সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন—লাইসেন্স ছাড়া কীভাবে এতদিন ধরে শত শত কোটি টাকার টিকিট ও কার্গো বাণিজ্য চলতে পারে?
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, “জিএসএ লাইসেন্স শুধু প্রশাসনিক অনুমতি নয়, এটি যাত্রী সুরক্ষা, আর্থিক জবাবদিহি ও আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্সের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও যদি কোনও প্রতিষ্ঠান টিকিট বিক্রি ও বৈদেশিক লেনদেন চালিয়ে যায়, তাহলে সেটি নিয়ন্ত্রক দুর্বলতার স্পষ্ট উদাহরণ।” তিনি আরও বলেন, “এ ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে পুরো এভিয়েশন খাতের নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নিয়েই প্রশ্ন উঠবে।”
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, লাইসেন্সবিহীন এজেন্টের মাধ্যমে টিকিট কেনা বা কার্গো বুকিং যাত্রীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কোনও ফ্লাইট বাতিল হলে বা রিফান্ড নিয়ে জটিলতা তৈরি হলে আইনি প্রতিকার পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। পাশাপাশি বৈধ লাইসেন্স ছাড়া বৈদেশিক লেনদেন চলতে থাকলে অর্থপাচারের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
যাত্রীদের উদ্বেগ
নিয়মিত যাত্রী গোলাম মোস্তাফা টুকু বলেন, “আমরা যখন বড় এয়ারলাইন্সের টিকিট কিনি, তখন ধরে নিই সবকিছু নিয়ম মেনেই হচ্ছে। কিন্তু পরে যদি জানা যায় এজেন্টের লাইসেন্সই নেই, তাহলে যাত্রীরা তো ঝুঁকিতে পড়ে যায়।” নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সের স্থানীয় একটি জিএসএ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, “আমরা নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই লাইসেন্স নবায়নের আবেদন করেছি। সব নথি ও ফি জমা দেওয়ার পরও আবেদন ঝুলে আছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ও যাত্রীসেবা সচল রাখতে আমাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হচ্ছে।” তিনি বলেন, “দ্রুত এ জটিলতার সমাধান না হলে ব্যবসা পরিচালনায় বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।”



