তামিলনাড়ু নির্বাচন: থালাপতি বিজয়ের উত্থানে দ্রাবিড় রাজনীতির পতন
তামিলনাড়ু নির্বাচন: বিজয়ের উত্থানে দ্রাবিড় রাজনীতির পতন

ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন শুধু চমকপ্রদ ফলই দেয়নি, বরং বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনও এনে দিয়েছে। বহু বছর ধরে রাজ্যটিতে যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা ছিল, সেটি এবার নড়বড়ে হয়ে গেছে।

দুই দ্রাবিড় দলের প্রতি অনাস্থা

কয়েক দশক পর তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে প্রথমবারের মতো দুই প্রধান দ্রাবিড় দল—দ্রাবিড় মুনেত্র কাজাগাম (ডিএমকে) ও অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুনেত্র কাজাগাম (এআইএডিএমকে) শুধু প্রতিদ্বন্দ্বিতাই নয়, বরং একধরনের নীরব প্রত্যাখ্যানের মুখে পড়েছে। নির্বাচনী প্রচারণা চলার সময় এ পরিবর্তনের আভাস তেমন একটা পাওয়া যায়নি। কোনো বড় ধরনের সরকারবিরোধী ঢেউও দেখা যায়নি; বরং বিভিন্ন অঞ্চল, বিশেষ করে শহরাঞ্চলের ভোটারদের আচরণের মধ্য দিয়ে তা প্রকাশ পেয়েছে।

কিছু ভোটারের কাছে ডিএমকে অনেকটাই প্রতিষ্ঠিত ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক দল। তারা শাসনব্যবস্থা পরিচালনার পাশাপাশি ক্ষমতাকে আরও সংহত করেছে। অন্যদিকে নেত্রী জয়ললিতার মৃত্যুর পর এআইএডিএমকে এখনো নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি পুরোপুরি পুনরুদ্ধার করতে পারেনি বলে অনেকে মনে করেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এ নির্বাচনে ভোটাররা দ্রাবিড় রাজনীতিকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেননি। তবে তাঁরা দ্রাবিড় রাজনীতির বর্তমান নেতৃত্বের ওপর অনাস্থা প্রকাশ করেছেন। আর এই অসন্তোষের জায়গাটিই অনেক ক্ষেত্রে বিজয়কে সুবিধা দিয়েছে।

পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ও নতুন মুখের খোঁজ

তামিলনাড়ুতে ক্ষমতার পরিবর্তন নতুন কিছু নয়। অতীতেও এমন পরিবর্তন দেখা গেছে। তবে এবারের নির্বাচন ছিল ভিন্ন। কারণ, এখানে ভোটাররা তাঁদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে শুধু ভাবনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি, সেটি বাস্তবে রূপ দিয়েছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ভোটাররা শুধু পরিবর্তন চায়নি, তাঁরা যেন সে পরিবর্তনের ওপর আস্থা রেখেই ভোট দিয়েছেন। এ প্রেক্ষাপটে বিজয় এক বিরল রাজনৈতিক মুখ হিসেবে উঠে আসেন—একজন বহিরাগত নেতা, যিনি ধারণার পর্যায়ে হলেও জাতি, শ্রেণি ও আঞ্চলিক বিভাজনের বাইরে গিয়ে মানুষকে এক জায়গায় আনতে সক্ষম হয়েছেন বলে মনে করা হয়।

বিজয়ের জনপ্রিয়তা এমন সব গোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, যারা সাধারণত একই রাজনৈতিক ধারায় একসঙ্গে ভোট দেয় না—যেমন তরুণ প্রথমবারের ভোটার, শহুরে ভাসমান ভোটার, কিছু নারী ভোটার এবং এমনকি একটি অংশ প্রবীণ ভোটারও, যাঁরা তাঁকে সুযোগ দিতে চেয়েছেন। ফলে এটি কোনো নির্দিষ্ট নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ছিল না, বরং সম্ভাবনার ওপর একটি বড় ধরনের আস্থার ভোট।

তৃতীয় শক্তির পতন

তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে দীর্ঘদিন তামিল জাতীয়তাবাদী নেতা সেন্থামিজান সিমানের নেতৃত্বাধীন ‘নাম তামিলার কাচি’র (এনটিকে) মতো ছোট দলগুলো ডিএমকে ও এআইএডিএমকের দ্বিদলীয় রাজনীতির বাইরে একটি তৃতীয় জায়গা তৈরি করে রেখেছিল। তবে এবারের নির্বাচনে সেই জায়গা কার্যত সংকুচিত হয়ে গেছে বলে মনে করা হচ্ছে। সিমান শুধু দলের প্রভাব বিস্তার করতে ব্যর্থ হননি, বরং নির্বাচনী কৌশলে পিছিয়েও পড়েছেন। এমনকি তিনি নিজের আসনও হারিয়েছেন।

এই নির্বাচনী ফলাফলের প্রতীকী বার্তাটি স্পষ্ট। তা হলো, আগে বড় দলের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেওয়া ভোটারদের ভোটগুলো ছোট ছোট দলের দিকে যেত। আর এবার তা শক্তিশালী বিকল্প শক্তির দিকে একত্র হয়েছে। ফলে বলা যায়, রাজনীতির সেই ‘তৃতীয় জায়গাটি’ এখন আগের মতো আর নেই। তার জায়গা দখল করেছে নতুন এই উদীয়মান শক্তি।

চেন্নাইয়ে বড় পরিবর্তন

এ নির্বাচনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবিটা দেখতে চাইলে চেন্নাইয়ের দিকে তাকাতে হবে। দীর্ঘদিন তামিলনাড়ু রাজ্যের এই রাজধানী শহরটির রাজনীতিতে সীমিত পরিবর্তন দেখা গেছে। কখনো কখনো রাজনৈতিক সমীকরণ বদলালেও কোনো বড় রাজনৈতিক শক্তির পুরোপুরি পতনের ঘটনা খুব একটা দেখা যায়নি। ২০২১ সালে দ্রাবিড় মুনেত্র কাজাগাম চেন্নাইয়ের ১৬টি আসনের সব কটিই জিতে নিয়ে আবারও শহরটিতে নিজেদের শক্ত অবস্থান প্রতিষ্ঠা করেছিল।

এবার পরিস্থিতি বদলে গেছে। সেই দুর্গ এখন ভেঙে পড়েছে। টিভিকে চেন্নাইয়ের অধিকাংশ আসনে বড় সাফল্য পেয়ে শহরের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনে দিয়েছে। আর চেপাউক ও হারবারের মতো হাতে গোনা কয়েকটি আসনে জয়ের মধ্য দিয়ে ডিএমকেকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে।

আন্নানগর, টিনগর, ভিল্লিভাক্কাম ও ভেলাচেরির মতো আসনগুলোয় কারা জয় পাবে, তা সাধারণত আগে থেকে অনুমান করা যায়। তবে এবার এ আসনগুলো কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার ময়দানে পরিণত হয়েছিল। এই পরিবর্তনের পেছনে মূল চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করেছেন শহুরে ভোটাররা। বিশেষ করে তরুণ, বেতনভুক্ত পেশাজীবী এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষেরা এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছেন। তাঁরা শুধু শাসনব্যবস্থা নয়, বরং রাজনৈতিক ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।

ভোট বনাম ক্ষমতা

বিজয়ের উত্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে সামনে এনেছে। সেটি হলো, আবেগের জায়গা থেকে মানুষকে এক করার মধ্য দিয়ে পাওয়া শাসনক্ষমতা কতটা টেকসই হবে? বিভিন্ন অঞ্চলে টিভিকের সমর্থন ছড়িয়ে পড়ার মধ্য দিয়ে বিজয়ের জনপ্রিয়তা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তামিলনাড়ুর ইতিহাস বলছে, নির্বাচনে জিততে হলে অনেক দিনের গড়ে ওঠা শক্ত সাংগঠনিক কাঠামো এবং পরিকল্পিতভাবে ভোট নিজেদের পক্ষে আনার ক্ষমতা দরকার। তামিলনাড়ু রাজ্যে ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে তেমন সক্ষমতা তৈরি করেছিল।

তবে এবারের নির্বাচনে টিভিকের সাফল্য নতুন এক রাজনৈতিক মডেলের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তা হলো, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জনসমর্থনও বড় ফল এনে দিতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে বিজয় রাজ্যের রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্রে উঠে এসেছেন, আর পুরোনো রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যাচ্ছে।

ব্যবস্থা পুনর্গঠন, প্রতিস্থাপন নয়

তামিলনাড়ু তার অতীত রাজনৈতিক ধারাকে পুরোপুরি ত্যাগ করেনি; বরং এই নির্বাচন সেটিকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেছে। একসময় চলচ্চিত্র, আবেগ ও জনসংযোগের মতো যে বিষয়গুলো দ্রাবিড় রাজনীতির আধিপত্য গড়ে তুলেছিল, সেগুলোকেই এখন নতুন এক রাজনৈতিক শক্তি আবারও ব্যবহার করছে। তবে পার্থক্য হলো, বিজয় সেই উপাদানগুলো ব্যবহার করলেও মতাদর্শগত ও সাংগঠনিক ভিত্তিটা তিনি উত্তরাধিকারসূত্রে পাননি।

এ কারণেই মুহূর্তটি একই সঙ্গে শক্তিশালী এবং অনিশ্চিত। এ নির্বাচনের ফলাফল একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে। সেটি হলো, ভোটাররা পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত ছিল। নির্বাচনে টিভিকের বড় সাফল্য এবং ডিএমকে নেতা এম কে স্টালিনের নিজের আসনে পরাজয়ের মধ্যে তারই প্রতিফলন ঘটেছে।