কক্সবাজারের এসপি আপেল মাহমুদের বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর অনিয়ম ও অপরাধের অভিযোগ
কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের এসপি (সুপারনিউমারারি অতিরিক্ত ডিআইজি) আপেল মাহমুদের বিরুদ্ধে একের পর এক অনিয়ম ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে, যা দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।
অনুমোদনহীন বিজ্ঞাপন বসানো ও অবৈধ ভাড়া আদায়
অভিযোগ রয়েছে, বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি ও জেলা প্রশাসনের অনুমোদন ছাড়াই আপেল মাহমুদ সৈকতের একটি অংশ ভাড়া দিয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। লাবণী থেকে কলাতলী পয়েন্ট পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকায় জুলফিকার নামে একটি স্টিল কোম্পানির বিজ্ঞাপন বসানোর ক্ষেত্রেও অনুমোদন না নিয়েই কাজটি করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ট্যুরিস্ট পুলিশের সদস্য ও সংশ্লিষ্ট কোম্পানির একজন কর্মকর্তা জানান, জেলা প্রশাসন অনুমোদন না দেওয়ায় আপেল মাহমুদকে ৩০ লাখ টাকা দিয়ে তার সহযোগিতায় এই বিজ্ঞাপন বসানো হয়েছে। বিষয়টি তার কাছে জানানো হলে তিনি ভুল স্বীকার করে কিছু বিজ্ঞাপন সরানোর ভিডিও পাঠান, কিন্তু পরবর্তীতে সাইনবোর্ডগুলো অক্ষত দেখা গেছে।
এছাড়াও, পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য নির্মিত ওয়াচ টাওয়ার, অভিযোগ কেন্দ্র, পুলিশ বক্স ও সরকারি জেট স্কি অবৈধভাবে ভাড়া দিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। লাবণী পুলিশ ফাঁড়ির সামনের একটি ওয়াচ টাওয়ার রেস্টুরেন্টে রূপান্তর করে ৮ লাখ টাকা অগ্রিম নিয়ে ভাড়া দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের অভিযোগ
আপেল মাহমুদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের গুরুতর অভিযোগও উঠেছে। লায়লা পরী নামে এক নারী দাবি করেছেন, তাকে জুসের সঙ্গে কিছু মিশিয়ে কলাতলীর একটি হোটেলে নিয়ে গিয়ে আপেল মাহমুদ ধর্ষণ করেন। উখিয়া থানা পুলিশ তাকে উদ্ধার করার পর তিনি ভিডিও বার্তায় এই অভিযোগ তুলে ধরেন।
প্রতিবেদক মেয়েটির ছবি আপেল মাহমুদকে পাঠালে তিনি আতঙ্কিত হয়ে তার ক্যারিয়ার রক্ষার জন্য অনুরোধ জানান এবং পরে গোপনে ওই নারীর বিরুদ্ধে জিডি করেন। এছাড়াও, কক্সবাজারে কমপক্ষে ১৫ জন তরুণী তার লালসার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, যাদের মধ্যে পাঁচজন সরল স্বীকারোক্তি দিয়েছেন।
মাদক আত্মসাৎ ও ঘুষ আদায়
২০২৫ সালের ৭ নভেম্বর সুগন্ধা হাইপেরিয়ান সি ওয়ার্ড নামের একটি হোটেলে ইয়াবার চালান উদ্ধারের সময় আপেল মাহমুদসহ ট্যুরিস্ট পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। অভিযোগ রয়েছে, ঘটনাস্থলে প্রায় ২০ হাজার ইয়াবা থাকলেও মামলায় মাত্র ২০০ পিস দেখিয়ে হোটেলের এক স্টাফকে আসামি করা হয় এবং আপেল মাহমুদের সঙ্গে ১০ লাখ টাকায় বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হয়।
তিনি কটেজ জোনের পতিতালয় ও অবৈধ স্পা থেকে মাসিক ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত মাসোয়ারা আদায় করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। দালাল ও স্থানীয় নামধারী সাংবাদিকদের মাধ্যমে এসব টাকা তোলা হয় এবং সায়মন হেরিটেজ রেস্টুরেন্টে নিয়মিত আড্ডা ও মাদকের আসর বসে বলে জানা গেছে।
আপেল মাহমুদের প্রতিক্রিয়া
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আপেল মাহমুদ প্রতিবেদককে বড় ভাই সম্বোধন করে বলেন, "আপনি হলেন আমার বড় ভাই, আপনার কাছে সারেন্ডার করছি। আমি ফেসবুক থেকে সবকিছু এখন ডিলিট করে দিচ্ছি। ভয়ে বাঁচার জন্য এসব করেছি।" তিনি আরও বলেন, "আপনি যা বলেন তার বাইরে আমি চলব না। কলিজার ভাই আমার, আপনি যেমন নির্দেশ দেবেন তেমন করে চলব।"
তিনি দাবি করেন, সাংবাদিকের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝির কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং তিনি তার ঊর্ধ্বতনদের কাছে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন।
এই কেলেঙ্কারি কক্সবাজারের পর্যটন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে, এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।



