সড়ক প্রকল্পের টাকায় ভবনবিলাস: দুর্নীতির নতুন নজির
সড়ক প্রকল্পের টাকায় ভবনবিলাস: দুর্নীতির নজির

আইসিইউর সংকটে হামে যখন একের পর এক শিশুর মৃত্যু হচ্ছে, টিসিবির ন্যায্যমূল্যের ট্রাকের পেছনে যখন উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে জেরবার মানুষের ভিড় বাড়ছে, তখন সড়ক প্রকল্পের টাকায় ভবনবিলাসের খবর আমাদের যারপরনাই বেদনাহত করে। বিদেশ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে সড়ক সম্প্রসারণের টাকায় পুরোপুরি অপ্রয়োজনীয়ভাবে নির্মাণ করা হচ্ছে বিলাসী ভবন, সুইমিংপুল, অবকাশকেন্দ্রের মতো স্থাপনা।

দুর্নীতির পাঠ্যপুস্তকীয় উদাহরণ

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে উন্নয়ন প্রকল্প মানেই দুর্নীতি আর রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে সরকারি অর্থের নয়ছয় এবং সরকারঘনিষ্ঠ কিছু গোষ্ঠীর অর্থ লোপাটের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সাসেক সংযোগ সড়ক প্রকল্প–২ তার আরও একটি পাঠ্যপুস্তকীয় উদাহরণ।

প্রকল্পের বিবরণ

প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, দক্ষিণ এশীয় উপ–আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা বা সাসেক প্রকল্প অনুমোদন হয় ২০১৬ সালে। এর আওতায় টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা থেকে রংপুর পর্যন্ত ১৯০ কিলোমিটার মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার কাজ শুরু হয়। শুরুতে ব্যয় ১১ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা ও শেষ হওয়ার সময়সীমা ২০১৯ সাল নির্ধারণ করা হলেও যথারীতি আর সব প্রকল্পের মতো কয়েক দফা ব্যয় ও সময় বাড়ানো হয়। এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও গত মার্চ মাস পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি ৮৯ শতাংশ। মূল প্রকল্পের ব্যয় সাত হাজার কোটি টাকা ও সময় সাত বছর বাড়ানোর পরও আবার সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির উদ্যোগ চলছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রশ্ন ও উদ্বেগ

প্রশ্ন হচ্ছে, নির্ধারিত সময় ও বাজেটে কাজ শেষ করতে না পারার কারণে যেখানে ঠিকাদারি সংস্থাকে জবাবদিহি করা প্রয়োজন, তার বদলে উল্টো পুরস্কৃত করার পেছনে স্বার্থটা কার? সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে, এই প্রকল্পে মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করতে গিয়ে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হচ্ছে ২০০ কোটি টাকার বেশি। বিস্ময়কর বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশে সড়ক নির্মাণ খরচ ভারত, পাকিস্তান, চীন, তুরস্কের চেয়ে দুই থেকে চার গুণ বেশি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আমরা মনে করি, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক যথার্থই বলেছেন, বিলাসী ব্যয়, যোগসাজশ করে উপকরণ কমানো–বাড়ানোর কারণে এশিয়া ও ইউরোপের অনেক দেশের চেয়ে বাংলাদেশে অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয় কয়েক গুণ বেশি।

প্রাতিষ্ঠানিক যোগসাজশের প্রমাণ

সাসেক সংযোগ সড়ক প্রকল্পের টাকায় সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) ভবনবিলাসই প্রমাণ করে, পারস্পরিক যোগসাজশের বিষয়টি কতটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার সঙ্গে রাজধানীর পাইকপাড়ায় ভবন নির্মাণের সম্পর্কসূত্রটা কোনো যুক্তিতেই বোধগম্য নয়। রাজধানীর তেজগাঁওয়ে যেখানে সওজের অত্যাধুনিক কার্যালয় আছে, সেখানে গবেষণাগার উন্নয়নের নামে ভবন নির্মাণ কেন। সরকারি সংস্থা হয়ে সওজ কীভাবে রাজউকের অনুমতি ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া ভবন নির্মাণ করতে পারে? দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, গাছ কেটে ও স্থপতি মাজহারুল ইসলামের স্থাপত্য ভেঙে এই ভবন নির্মাণকাজ চলছে। এখানে প্রশ্ন ওঠাটা স্বাভাবিক যে সওজ কি তাহলে আইন ও জবাবদিহির ঊর্ধ্বে?

প্রয়োজন স্বাধীন তদন্ত

আমরা মনে করি, ঋণদাতা পক্ষ, প্রকল্প কর্তৃপক্ষ থেকে শুরু করে মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা কমিশন, মন্ত্রিসভা কমিটি সব স্তরেই সুবিধাগোষ্ঠী থাকার কারণেই এটা সম্ভব হয়। আমরা মনে করি, একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটির মাধ্যমে পুরো বিষয়টি তদন্ত করা প্রয়োজন। দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলেই কেবল এমন লুণ্ঠনমূলক ব্যবস্থা বন্ধ হতে পারে।

সরকারের প্রতি আহ্বান

দুর্নীতি, কারসাজি করে ব্যয় বৃদ্ধি ও লুটপাটনির্ভর উন্নয়ন প্রকল্প থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে নাগরিকদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থানসহ মৌলিক সেবাগুলো নিশ্চিত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সরকারকে অবশ্যই উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি নাগরিক স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।