নোয়াখালী জেলা ছাত্রদলের নবগঠিত কমিটি প্রত্যাখ্যান করে পদবঞ্চিত নেতা-কর্মীরা সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। আজ সোমবার দুপুর ১২টায় শহরের টাউনহল মোড়ে এ বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। একইভাবে কক্সবাজার জেলা ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণার পর সেখানেও পদবঞ্চিতরা বিক্ষোভ করেন। গতকাল রোববার সন্ধ্যায় শহরের শহীদ সরণি মোড়ে প্রধান সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করেন তাঁরা।
নোয়াখালীতে বিক্ষোভ ও ককটেল বিস্ফোরণ
আজ দুপুর ১২টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত নোয়াখালী জেলা শহর মাইজদীর টাউন হল মোড়ে এবং প্রেসক্লাবের সামনে বিক্ষোভ করেন ছাত্রদলের পদবঞ্চিত নেতা-কর্মীরা। এ সময় বেশ কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিক্ষোভ চলাকালে সমাবেশস্থলের পাশে একাধিক ককটেল বিস্ফোরিত হয়। এ ছাড়া অজ্ঞাতস্থান থেকে ছোড়া একটি ইটের টুকরা রিকশায় বসা এক পথচারীর ওপর পড়লে তাঁর কপাল ফেটে যায়। পরে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় তাঁকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। বিক্ষোভ চলাকালে শহরে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। সেখানে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন থাকায় বড় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
বিক্ষোভকারীরা অবিলম্বে ঘোষিত কমিটি বাতিল করে ত্যাগী ও জ্যেষ্ঠ নেতাদের দিয়ে নতুন করে কমিটি গঠনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। অন্যথায় কঠোর কর্মসূচি প্রণয়নের মাধ্যমে নিজেদের অধিকার আদায়ের ঘোষণা দেন।
বক্তব্য ও পদত্যাগ
শহরের টাউন হল মোড়ের সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভের সময় বক্তব্য দেন নতুন কমিটিতে জ্যেষ্ঠ সহসভাপতির পদ পাওয়া আনোয়ার হোসেন ওরফে রকি, একই কমিটির সহসভাপতি শাহেদ চৌধুরী ওরফে বাবু, পৌর ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক মো. ওয়াসিম, নোয়াখালী সরকারি কলেজ ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আকবর হোসেন প্রমুখ। বক্তারা বলেন, 'দীর্ঘ ১৭ বছর আমরা আন্দোলন সংগ্রাম করেছি। জেল খেটেছি, নানা অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করেছি। কিন্তু নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে আমাদের মূল্যায়ন করা হয়নি। কমিটি গঠনে কোনো ধরনের নিয়মনীতির তোয়াক্কা করা হয়নি। রাতের অন্ধকারে পকেট কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে।'
টাউন হল মোড়ের বিক্ষোভ শেষে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা নোয়াখালী প্রেসক্লাবে যান। সেখানে বেলা একটার দিকে সংবাদ সম্মেলন করে নবগঠিত জেলা ও পৌরসভা ছাত্রদলের কমিটি প্রত্যাখ্যান করেন। এ সময় শাহেদ চৌধুরী, আকবর হোসেন, মো. ওয়াসিমসহ নব গঠিত কমিটির বিভিন্ন পদে থাকা ১০ জন নেতা পদত্যাগের ঘোষণা দেন। পদত্যাগী নেতারা বলেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ঘোষিত কমিটি বাতিল করে নতুন কমিটি ঘোষণা করা না হলে তাঁরা দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের নিয়ে গণপদত্যাগ কর্মসূচি পালন করবেন।
পুলিশের বক্তব্য
সুধারাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, 'ছাত্রদলের পদবঞ্চিত নেতা-কর্মীরা তাদের দাবিদাওয়া নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেছে। এ সময় কিছুক্ষণ তাঁরা সড়কে অবস্থান করে। এ নিয়ে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।' এক প্রশ্নের জবাবে ওসি বলেন, কেউ আহত হওয়ার খবর তাঁর জানা নেই। অন্য কোনো ঘটনায় কেউ আহত হয়ে থাকতে পারেন। তবে ওই ঘটনার সঙ্গে ছাত্রদলের কর্মসূচির সম্পর্ক নেই।
কক্সবাজারে বিক্ষোভ
দীর্ঘ দুই বছর পর কক্সবাজার জেলা ছাত্রদলের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে গত শনিবার। সাত সদস্যের ওই কমিটিতে যোগ্য ও ত্যাগী নেতাদের স্থান হয়নি দাবি করে রোববার রাতে শহরের প্রধান সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করেন পদবঞ্চিত ছাত্রদল নেতা-কর্মীরা। এর আগে জেলা বিএনপি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে আরও কয়েকজন নেতা আংশিক কমিটি বিলুপ্ত করে ত্যাগীদের নিয়ে নতুন কমিটি ঘোষণার দাবি জানান।
নতুন কমিটি নিয়ে দলের ভেতরে মতবিরোধ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। পদবঞ্চিতদের কয়েকজন নেতা বলেন, কক্সবাজার-৩ (সদর, রামু ও ঈদগাঁও) আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজলের সঙ্গে থেকে রাজনীতি করার কারণেই অনুসারীদের নতুন কমিটিতে জায়গা দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে নতুন কমিটিকে স্বাগত জানিয়ে বিভিন্ন উপজেলাতে আনন্দ মিছিল, মিষ্টি বিতরণও চলছে।
নতুন কমিটির বিবরণ
গত শনিবার কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি মো. রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ছাত্রদলের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। তাতে ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফাহিমুর রহমানকে সভাপতি, মো. সাঈদ আনোয়ারকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। আংশিক কমিটিতে মো. হোসেন মাদুকে সিনিয়র সহসভাপতি, জাহেদ নুর জিতুকে সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সৈয়দ মুহাম্মাদ সালমান বাপ্পিকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং আশরাফ ইমরানকে সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়েছে। চিঠিতে আগামী এক মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
জেলা ছাত্রদলের সর্বশেষ আংশিক কমিটির অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল ২০১৮ সালের ১৯ আগস্ট। ওই কমিটিতে শাহাদাত হোসাইন রিপনকে সভাপতি ও ফাহিমুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছিল। ২০২৪ সালের ১৫ আগস্ট ওই কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছিল।
প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনা
নতুন আংশিক কমিটি ঘোষণার পরপরই শুরু হয়েছে বিতর্ক, আলোচনা ও সমালোচনা। পদবঞ্চিত নেতারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ও হতাশা ব্যক্ত করেন। রোববার সন্ধ্যায় শহরের জেলা বিএনপি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে ছাত্রদল নেতা মিজানুল করিম বলেন, 'বিগত ১০ বছর ধরে ফ্যাসিস্ট সরকারের নির্যাতনে নিপীড়ন সহ্য করেছি। তবু রাজনীতি থেকে পিছপা হইনি। শত বাধার মধ্যেও ছাত্রদলকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু কমিটিতে আমার জায়গা হয়নি। কারণ, আমি সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজলের অনুসারী।'
তবে কমিটি যোগ্য নেতাদের নিয়েই হয়েছে বলে দাবি ছাত্রদলের নতুন কমিটির সভাপতির। নতুন কমিটির সভাপতি ফাহিমুর রহমান বলেন, 'যোগ্য নেতাদের নিয়ে জেলা ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। পদবঞ্চিত ও ত্যাগীদের নতুন কমিটিকে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ আছে। আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে ছাত্রদলকে এগিয়ে নিতে চাই।'



