নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সিআইডি পরিচয়ে এক যুবককে অপহরণ করে তুলে নেওয়ার সময় গণপিটুনির শিকার হয়েছেন ঢাকা জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের চার সদস্য। এ ঘটনায় মামলার পর পুলিশের ওই চার সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে তিন জন গণপিটুনির শিকার হয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।
গ্রেফতারকৃতরা
গ্রেফতারকৃতরা হলেন- ডিবির এসআই মামুন মাতুব্বর (৪০), এএসআই আমান উল্লাহ (৩৪), কনস্টেবল কবির (৩৩) ও আকাশ আহমেদ (৩০)।
স্থানীয়দের অভিযোগ
স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি চক্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে নিরীহ মানুষকে আটক করে অপহরণ করতো এবং পরে পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করতো।
এর ধারাবাহিকতায় গত বৃহস্পতিবার বিকালে রূপগঞ্জ উপজেলার ভুলতা গাউসিয়া এলাকায় অমিত হাসান মিরাজ (৩০) নামে এক যুবককে অপহরণ করার অভিযোগ ওঠে। তখন স্থানীয়দের গণপিটুনির শিকার হন ডিবি পুলিশের সদস্য মামুন, আমান ও কবির। পরে তাদের পাশের আড়াইহাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখান থেকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
মামলা দায়ের
এ ঘটনায় শুক্রবার (২০ জুন) সকালে সোনারগাঁ উপজেলার হাবিয়া বৈদ্যপাড়া এলাকার বাসিন্দা অমিত হাসান মিয়াজ বাদী হয়ে রূপগঞ্জ থানায় একটি মামলা করেন। মামলায় ছয় জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার আসামিরা হলেন, ঢাকা দক্ষিণ ডিবি কার্যালয়ে কর্মরত পুলিশের এসআই মামুন মাতুব্বর, এএসআই আমান উল্লাহ, পুলিশ সদস্য কবির, আকাশ আহমেদ, ড্রাইভার আবু বক্কর সিদ্দিক এবং সেলিম মিয়া।
ভুক্তভোগীর পরিচয়
মামলার বাদী অমিত হাসান মিরাজ সোনারগাঁয়ের বৈদ্যপাড়ার এরশাদ আলীর ছেলে। তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অর্থায়নে ইনস্টিটিউট ফর ডেভেলপিং সায়েন্স অ্যান্ড হেলথ ইনিশিয়েটিভ প্রোগ্রামের ফিল্ড সুপারভাইজার ছিলেন। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় বর্তমানে বেকার আছেন।
ঘটনার বিবরণ
মামলার এজাহারে তিনি উল্লেখ করেছেন, বৃহস্পতিবার তিনি এক আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা করতে গাউসিয়া এলাকায় যান। সেখানে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট সিআইডির সদস্য পরিচয় দিয়ে গ্রেফতার চার পুলিশ সদস্যসহ তাদের আরও দুজন সহযোগী তাকে অপহরণের চেষ্টা চালান।
অনলাইন ক্যাসিনোর তদন্তের কথা বলে গাউসিয়ার একটি পাবলিক টয়লেটে তারা তাকে অবরুদ্ধ করে রাখেন। তার মোবাইল চেক করেন। মোবাইলে কিছু না পেয়ে তাদের সঙ্গে গাড়িতে তুলে নিয়ে যেতে চাইলে চিৎকার করেন। তখন আশপাশের লোকজন তাদের ভুয়া পুলিশ বলে গণপিটুনি দেন।
ঘটনার সময় অভিযুক্তরা সাদা পোশাকে ছিলেন বলে জানান ভুক্তভোগী অমিত। তাদের সাদা পোশাকে থাকার বিষয়টি রূপগঞ্জ থানা পুলিশও জানিয়েছে।
পূর্বের অপহরণের ঘটনা
মামলায় অমিত আরও উল্লেখ করেন, ১৫ জুন তার এক আত্মীয়কেও একই পুলিশ সদস্যরা অপহরণ করে কেরানীগঞ্জে নিয়ে যান। পরে পরিবারের সদস্যরা তাকে আড়াই লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়িয়ে আনেন। এক মাস আগেও জাকির হোসেন নামে আরেক ব্যক্তিকেও একইভাবে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করে।
অমিত বলেন, আগের অপহরণের ঘটনায় যে তারাই যুক্ত ছিলেন, তা আমার ঘটনার পর আত্মীয়-স্বজনদের খবর দিলে জানতে পেরেছি। তারা কখনও সিআইডি, কখনও ডিবির নামে অপহরণ করে লোকজনের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করতেন।
পুলিশের বক্তব্য
পুলিশ জানিয়েছে, গণপিটুনির শিকারের পর আটক তিন পুলিশকে আড়াইহাজার উপজেলার শান্তিনগর এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আহত অবস্থায় তাদের আড়াইহাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রেফার করেন।
নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মেহেদী ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তারা তিন জন পুলিশের হেফাজতে চিকিৎসাধীন। শুক্রবার ভোররাতে ঢাকা থেকে অভিযুক্ত কনস্টেবল আকাশকে গ্রেফতার করা হয়। ভুক্তভোগী অমিত হাসানের মামলায় তাদের গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। ঘটনায় জড়িত অন্যদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ব্যাপারে রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ এইচ এম সালাউদ্দিন জানিয়েছেন, অমিতের অপহরণ চেষ্টার মামলায় চার পুলিশ সদস্যের দুই সহযোগী গাড়িচালক আবু বক্কর সিদ্দিক (৫০) ও মো. সেলিম (৪৫) পলাতক রয়েছেন। তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি গ্রেফতারদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণেরও প্রক্রিয়া চলছে।
স্থানীয়দের দাবি
স্থানীয়দের দাবি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে অপহরণ ও অর্থ আদায়ের ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সবার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।



