মুখস্থনির্ভর শিক্ষার বিকল্প হিসেবে ফুটবল প্রতিযোগিতার গুরুত্ব
মুখস্থনির্ভর শিক্ষার বিকল্পে ফুটবলের গুরুত্ব

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো মুখস্থনির্ভরতা। একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের ওপর বইয়ের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে শিক্ষাকে কোচিং, প্রাইভেট ও গাইড বইনির্ভর করে তোলা হয়েছে। তোতা পাখির মতো মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় সেটা উগরে দেওয়ার যে শিক্ষাব্যবস্থা ঔপনিবেশিক কালপর্বে শুরু হয়েছিল, সেই দর্শন থেকে আমরা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে এখনো বের করে নিয়ে আসতে পারিনি। উপরন্তু তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল মাধ্যমের বিকাশ নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ ডিজিটাল স্ক্রিনে আসক্ত হয়ে পড়েছে। সব মিলিয়ে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সৃজনশীল, দক্ষ, যোগ্য ও মানবিক মানুষ তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় প্রভাব গিয়ে পড়ছে কর্মসংস্থান ও শ্রমবাজারের ওপর।

বৃহত্তর এই প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সারা দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ফুটবল প্রতিযোগিতার আয়োজনটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ। প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ড কাপ নামে এই প্রতিযোগিতায় ছেলে–মেয়েদের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে ২০ জুন। বালক ও বালিকা বিভাগের ফাইনালে ওঠা চারটি দলই ঢাকার বাইরের। প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, ৬ এপ্রিল পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে এই প্রতিযোগিতা শুরু হয়। দেশের ৬৫ হাজারের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এখানে অংশ নেয়। বালক ও বালিকা বিভাগ মিলিয়ে প্রায় ২২ লাখ শিক্ষার্থী প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। ইউনিয়ন বা পৌরসভা পেরিয়ে থানা বা উপজেলা, এরপর জেলা ও বিভাগীয় পর্যায় শেষে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বহুমুখী গুরুত্ব

আমরা মনে করি, প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যায়ে এই প্রতিযোগিতার বহুমুখী গুরুত্ব রয়েছে। প্রথমত, সহশিক্ষার অংশ হিসেবে ফুটবল প্রতিযোগিতা শিশুদের দক্ষতা, শৃঙ্খলা ও টিমওয়ার্ক শেখাতে ভূমিকা পালন করতে পারে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) এক গবেষণায় উঠে এসেছে, ঢাকার শিশুরা প্রতিদিন প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ডিজিটাল স্ক্রিন দেখে কাটায়। শুধু ঢাকা নয়; অন্যান্য শহরাঞ্চলের শিশুদের মধ্যেও ডিজিটাল আসক্তি বাড়ছে। এতে দীর্ঘমেয়াদি ঘুমের অভাবে স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ, শেখার ক্ষমতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, শারীরিক বৃদ্ধিসহ সামগ্রিক মানসিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ফুটবল, ক্রিকেটসহ খেলাধুলা ডিজিটাল আসক্তি কাটিয়ে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের সুস্থ বিকাশে নিঃসন্দেহে সহায়ক ভূমিকা রাখে। তৃতীয়ত, এ ধরনের প্রতিযোগিতা ভবিষ্যতের ক্রীড়াবিদ তৈরির সূতিকাগার হিসেবে কাজ করে। এর বড় দৃষ্টান্ত বাংলাদেশের নারী ফুটবল দল। আঞ্চলিক পর্যায়ে ধারাবাহিক সাফল্যের স্বাক্ষর রাখা নারী ফুটবল দলের বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল প্রাথমিক পর্যায়ের এমন প্রতিযোগিতা থেকেই। শুধু প্রতিযোগিতা আয়োজন করলেই হবে না, এখান থেকে উঠে আসা প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের জন্য ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ, উন্নত কোচিং, পুষ্টি ও পরবর্তী পর্যায়ে অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা

শুধু প্রাথমিক পর্যায়ে নয়; মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ফুটবল, ক্রিকেটসহ অন্যান্য খেলাধুলার প্রতিযোগিতাকে কাঠামোগত রূপ দেওয়া প্রয়োজন। এর জন্য বছরব্যাপী সূচি তৈরি করাটা জরুরি। সরকার সনদভিত্তিক শিক্ষার পাশাপাশি ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও অন্যান্য সহশিক্ষা কার্যক্রমকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছে। এটা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। তবে এর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় থাকা জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহশিক্ষা কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নিতে হবে।