বগুড়ার গাবতলী উপজেলার সুখানপুকুর ইউনিয়নের মোমিনহাটা দক্ষিণপাড়া গ্রামে নিজ বাড়ির শয়নকক্ষে গৃহবধূ রীতা রানী মজুমদারকে (৪৫) গলা কেটে হত্যার রহস্য উন্মোচিত হয়েছে। জমি বিক্রির টাকা চুরি করতে এসে চিনে ফেলায় একই এলাকার আনোয়ার হোসেন নামে এক দুর্বৃত্ত হাঁসুয়া দিয়ে আঘাত করলে তিনি মারা যান।
গ্রেফতার ও জব্দ
হত্যাকাণ্ডে জড়িত দুজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং হত্যায় ব্যবহৃত দুটি হাঁসুয়া ও অন্যান্য সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। সোমবার বিকালে তাদের ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ডের জন্য আদালতে পাঠানো হয়েছে। গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন- বগুড়ার গাবতলী উপজেলার সুখানপুকুর ইউনিয়নের মোমিনহাটা পূর্বপাড়ার মোখলেছার রহমানের ছেলে আনোয়ার হোসেন (৩৫) ও একই গ্রামের ফরিদ প্রামাণিকের ছেলে শাওন মিয়া (২০)। তারা দুজন পেশায় দিনমজুর।
নিহতের পরিচিতি
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, নিহত রীতা রানী মজুমদার বগুড়ার গাবতলীর সুখানপুকুর ইউনিয়নের মোমিনহাটা দক্ষিণপাড়া গ্রামের বিধান চন্দ্র মজুমদারের স্ত্রী। তাদের এক ছেলে রুয়েট প্রকৌশলী বিশ্বজিৎ মজুমদার এবং মেয়ে প্রার্থনা মজুমদার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তরে অধ্যয়নরত। চাকরি ও পড়াশোনার কারণে দুজন ঢাকায় অবস্থান করেন। এ কারণে বাড়িতে শুধু বিধান চন্দ্র মজুমদার ও রীতা রানী মজুমদার বসবাস করেন। ওই দম্পতি কয়েকদিন আগে ৪-৫ লাখ টাকা মূল্যে জমি বিক্রি করেন। টাকাগুলো রীতা রানীর কাছে ছিল।
ঘটনার বিবরণ
গত ২০ মে রাতে রীতা রানী মজুমদার ও তার স্বামী বিধান চন্দ্র মজুমদার খাবার শেষে আলাদা ঘরে ঘুমাতে যান। রাত সোয়া ১২টার দিকে শব্দ শুনে বিধান মজুমদারের ঘুম ভেঙে যায়। এরপর তিনি স্ত্রীর কক্ষ থেকে গোঙানির শব্দ শুনে সেখানে গিয়ে দেখেন দরজা খোলা এবং রীতা রানীর গলাকাটা রক্তাক্ত লাশ মেঝেতে পড়ে আছে। তার চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে এলে ঘাতকরা পালিয়ে যান। এ ব্যাপারে নিহতের ছেলে বিশ্বজিৎ মজুমদার গাবতলী মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন।
তদন্ত ও গ্রেফতার
গাবতলী থানার ওসি রাকিব হাসান জানান, ক্লুলেস এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে তথ্যপ্রযুক্তি ও গোপন অনুসন্ধান শুরু করা হয়। তদন্তের এক পর্যায়ে শনিবার রাতে শাওন মিয়াকে নিজ বাড়ি থেকে গ্রেফতার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে শাওন এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে এবং আনোয়ার হোসেনের নাম প্রকাশ করে। পরে পুলিশ আনোয়ার হোসেনকে গ্রেফতার করে।
তিনি বলেন, স্বীকারোক্তিতে শাওন মিয়া ও আনোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, তারা দুজন একসঙ্গে দিনমজুরের কাজ করেন। আনোয়ার প্রায় ১০দিন আগে জানতে পারেন- রীতা রানী মজুমদার বাড়িতে জমি বিক্রির টাকা রেখেছেন। এরপর দুজন ওই টাকা লুটের পরিকল্পনা করেন। এর অংশ হিসেবে আনোয়ার স্থানীয় সৈয়দ আহমদ কলেজ বাজার থেকে ছয়শ টাকা দিয়ে দুটি হাঁসুয়া কেনেন।
তিনি আরও বলেন, গত ২০ মে রাত ৮টার দিকে রীতা রানী ও তার স্বামী বিধান মজুমদার বাড়ির বাইরে ধান ও খড় তোলার জন্য যান। এ সময় দুই আসামি বাড়িতে ঢুকে গরুর খাবার রাখার ঘরে লুকিয়ে পড়েন। এরপর রাত সোয়া ১২টার দিকে শাওন গৃহবধূ রীতার ঘরের দরজায় ধাক্কা দেন। শব্দ পেয়ে রীতা টর্চলাইট নিয়ে বাইরে আসেন এবং আনোয়ারকে চিনে ফেলেন। তখন আনোয়ার ভয় পান এবং হাতে থাকা হাঁসুয়া দিয়ে রীতার গলায় কোপ দেন। এতে গলা কেটে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়। হত্যাকাণ্ডের পর টাকা নেওয়ার সুযোগ না পাওয়ায় দুজন পালিয়ে যান। এরপর তারা হাঁসুয়া দুটি স্থানীয় বিলের কচুরিপানার মধ্যে ফেলে দেন।
আদালতে প্রেরণ
আনোয়ার ও শাওনের স্বীকারোক্তিতে রোববার মধ্যরাতে বিল থেকে দুটি হাঁসুয়া, হত্যার সময় পরনে থাকা কাপড় ও দুটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়। পুলিশ কর্মকর্তা আরও জানান, আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ডের জন্য সোমবার বিকালে আনোয়ার হোসেন ও শাওন মিয়াকে বগুড়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠানো হয়েছে। হত্যার রহস্য উন্মোচিত হওয়ায় নিহত রীতা রানীর ছেলেমেয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তারা ঘাতকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হিসেবে ফাঁসি দাবি করেছেন।



