শিশু ধর্ষণ-হত্যা প্রতিরোধে আইন নেই, সচেতনতাই সমাধান
শিশু ধর্ষণ-হত্যা প্রতিরোধে আইন নেই, সচেতনতাই সমাধান

ঢাকার পল্লবীতে শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা পুরো বাংলাদেশকে নাড়া দিয়েছে। গত এক মাসে অন্তত আরও তিনটি শিশু একই ধরনের ঘটনার শিকার হয়েছে। এদের প্রত্যেকের বয়স চার থেকে দশ বছরের মধ্যে। গত ৬ মে থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় শিশুরা নৃশংসতার শিকার হয়েছে বলে বিবিসি বাংলার খবরে জানানো হয়েছে।

সাম্প্রতিক ঘটনা

গত ১৪ মে ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল উপজেলায় নিখোঁজের একদিন পর চার বছর বয়সি শিশু লামিয়া আক্তারের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় গ্রেফতার নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মুরশালিন জিজ্ঞাসাবাদে শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যার কথা স্বীকার করেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

ওই ঘটনার দুই দিন পর ১৬ মে মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলায় ১০ বছর বয়সি এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ একজনকে গ্রেফতার করেছে। গত ১৯ মে পাবনার চাটমোহরে টাকার প্রলোভন ও ঘর ঝাড়ু দেওয়ার কথা বলে ডেকে নিয়ে পঞ্চম শ্রেণির এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমের বরাত দিয়ে ৬ মে সিলেটের জালালাবাদ এলাকায় চার বছর বয়সি এক শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টার পর শ্বাসরোধে হত্যার ঘটনা জানিয়েছে। মার্চ মাসে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে এক শিশুর রক্তাক্ত ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল, যাকে ধর্ষণচেষ্টার পর শ্বাসনালী কেটে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। চিকিৎসাধীন অবস্থায় দশ বছরের নিচে ওই শিশুটিও মারা যায়। এক বছর আগে মাগুরার আট বছর বয়সি শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় পুরো বাংলাদেশ প্রতিবাদে ফেটে পড়েছিল।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আইনি অবস্থা

এইচআরএসএস-এর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সারাদেশে ৫৮০ জন শিশু ধর্ষণ এবং ৩১৮ জন যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। কিন্তু এসব ঘটনা প্রতিরোধে বাংলাদেশে কোনো আইনী ব্যবস্থা আছে কি? মানবাধিকার কর্মী, আইনজীবী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, বাংলাদেশে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট কোনো আইন নেই।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী ফওজিয়া করিম বলেন, যৌন হয়রানি বা এ সংক্রান্ত অপরাধ প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট কোনো আইন নেই। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে উচ্চ আদালতের নির্দেশে একটি নীতিমালা আছে, কিন্তু সেটি আইনে পরিণত হয়নি। তিনি জনসচেতনতা সৃষ্টিকে সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করেন।

অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, অপরাধীর প্রোফাইল তৈরির জন্য পুলিশের একটি সফটওয়্যার রয়েছে। পুলিশ হেডকোয়ার্টারের মুখপাত্র এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, সামাজিক অবক্ষয়, পারিবারিক, ব্যক্তিগত ও অর্থনৈতিক দৈন্যতার কারণে এ ধরনের অপরাধ হয়। বিট পুলিশিং, কমিউনিটি পুলিশিংসহ নানা উপায়ে পুলিশ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়, কিন্তু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক অপরাধ প্রতিরোধ করা কষ্টসাধ্য।

যৌন হয়রানি প্রতিরোধ নীতিমালা

বাংলাদেশে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট আইন না থাকায় ২০০৮ সালে জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি একটি রিট করে। শুনানি শেষে ২০০৯ সালের ১৪ মে হাইকোর্ট রায় দিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে একটি নীতিমালা তৈরি করে দেয়। আইন প্রণয়ন না হওয়া পর্যন্ত এই নীতিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নীতিমালার লক্ষ্য হলো যৌন হয়রানি সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলা, এর নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে বোঝানো।

ফওজিয়া করিম বলেন, যৌন অপরাধীদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। তাকে মসজিদ, বাজার-ঘাটসহ সবকিছু থেকে প্রতিরোধ করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। গণমাধ্যমকেও জনসচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। তিনি বলেন, ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হলেও উন্নত দেশে মৃত্যুদণ্ড নিষিদ্ধ। একজনকে মেরে ফেললেই শেষ নয়, মানুষকে জানতে হবে। তাই অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া এবং মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা বেশি জরুরি।

পুলিশের ভূমিকা

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার এন এম নাসিরুদ্দিন বলেন, কোনো ঘটনা পুলিশে রিপোর্ট হলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। প্রায় পাঁচ বছর ধরে ক্রিমিনাল ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম নামে একটি সফটওয়্যারে অপরাধীদের তথ্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে। তবে এই সময়ের আগের অপরাধীদের তথ্য পাওয়া যাবে না। তিনি বলেন, ব্যক্তিগত বা ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স প্রতিরোধের কোনো উপায় নেই। পুলিশ দিয়ে ঘরের ভেতরের সহিংসতা ঠেকানো মুশকিল, কারণ এটি পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমেও হয়। তিনি পারিবারিক শিক্ষা, ব্যক্তিগত ও নৈতিক মূল্যবোধ তৈরি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেন।

রামিসা হত্যাকাণ্ড

পল্লবীতে শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। বৃহস্পতিবার (২১ মে) তিনি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারকে এই নির্দেশ দেন। আইনমন্ত্রী বলেছেন, দ্রুততম সময়ে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন করতে যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, সরকার গঠনের পর থেকে এ ধরনের প্রতিটি অপরাধের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর রয়েছে। তিনি বলেন, শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

এ ঘটনায় অভিযুক্ত সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে বুধবার (২০ মে) কারাগারে পাঠানো হয়েছে। প্রধান আসামি সোহেল রানা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে কীভাবে শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করেছেন তা বর্ণনা করেছেন।

ধর্ষণ আইন সংস্কার জোটের পক্ষে মানবাধিকার সংগঠন ব্লাস্ট শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেছে। জোটের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, প্রতিটি নাগরিকের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিশেষত নারী ও শিশুদের সুরক্ষা দেওয়া রাষ্ট্রের বাধ্যতামূলক দায়িত্ব। এ ধরনের সহিংসতা দেশের বিদ্যমান নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, শিশু আইন ও জাতিসংঘের নারীর প্রতি বৈষম্য বিলোপ সনদের সাথে সাংঘর্ষিক।