কুষ্টিয়ায় সেচপাম্প ট্রান্সফরমার চুরি: কৃষকের ঘাড়ে দায় চাপানো অবিচার
কুষ্টিয়ায় সেচপাম্প ট্রান্সফরমার চুরি, কৃষকের দায়

কুষ্টিয়ায় সেচপাম্প ট্রান্সফরমার চুরি: কৃষকের ঘাড়ে দায় চাপানো অবিচার

সম্পাদকীয়: সেচপাম্প কৃষি ব্যবস্থার একটি অপরিহার্য চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করে। কৃষকের কাছে সেচপাম্পের অনুপস্থিতি সরাসরি খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কুষ্টিয়ায় একের পর এক সেচপাম্পের ট্রান্সফরমার চুরি হচ্ছে, কিন্তু অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা যাচ্ছে না। বরং, চুরি হওয়া যন্ত্রের বিশাল আর্থিক ক্ষতি নিরীহ কৃষকদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা একটি চরম অবিচার হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

কুমারখালীতে ট্রান্সফরমার চুরির ধারাবাহিক ঘটনা

কুমারখালী উপজেলার জোতমোড়া গ্রামে সম্প্রতি এক রাতের মধ্যে দুটি ৫ কেভিএ ট্রান্সফরমারের খোলস ফেলে ভেতরের মূল্যবান যন্ত্রাংশ চুরি করে নিয়েছে সংঘবদ্ধ দুর্বৃত্তরা। এই সময়ে মাঠে বিভিন্ন ফসলের সমারোহ রয়েছে এবং সেচের প্রয়োজন অত্যন্ত জরুরি। ঠিক এমন মুহূর্তে এই ঘটনা ঘটানো প্রান্তিক কৃষকদের জন্য মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার সমতুল্য।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক ঘটনা নয়। কুমারখালী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির তথ্য অনুসারে, ২০২৩ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ওই এলাকায় কমপক্ষে ১১৭টি ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনা ঘটেছে। গত বছর ৩৩টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে, আর চলতি বছরের শুরুতে ইতিমধ্যে ৫টি চুরির ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

একটি নির্দিষ্ট এলাকায় এত বিপুলসংখ্যক ট্রান্সফরমার চুরির পরও চোর চক্রকে শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করা না যাওয়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং স্থানীয় প্রশাসনের সদিচ্ছা ও সক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের সন্দেহ তৈরি করেছে। এটি নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, ট্রান্সফরমার খুলে নেওয়ার মতো কাজ সাধারণ কোনো ছোটখাটো চোরের পক্ষে সম্ভব নয়; এর পেছনে শক্তিশালী ও সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত রয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এই ঘটনার সবচেয়ে নিষ্ঠুর দিকটি হলো পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের বর্তমান বিধান। এই বিধান অনুযায়ী, চুরি যাওয়া ট্রান্সফরমারের সম্পূর্ণ আর্থিক ক্ষতি কৃষককেই বহন করতে হয়। প্রতিটি ৫ কেভিএ ট্রান্সফরমারের দাম প্রায় ৫৯ হাজার টাকা। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফসল ফলানো কৃষকের পক্ষে বারবার এত টাকা দিয়ে নতুন যন্ত্র কেনা কি আদৌ সম্ভব? এই ব্যর্থতা কি কৃষকের, নাকি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার? চুরির দায় কৃষকের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া একটি চরম অবিচার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

কর্তৃপক্ষের দায়সারা বক্তব্য ও নীরবতা

পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি শুধুমাত্র 'গ্রাহককে সচেতন হতে' বলে দায় এড়িয়ে যাচ্ছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর এই দায়সারা বক্তব্য সমস্যার সমাধান করতে ব্যর্থ হচ্ছে। অন্যদিকে, পুলিশ বলছে যে 'লিখিত অভিযোগ পেলে' তারা ব্যবস্থা নেবে। শতাধিক চুরির ঘটনার পর পুলিশের এমন নীরবতা অপরাধীদের জন্য একটি বড় সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে।

সরকারের দায়িত্ব ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ

কৃষকদের বাঁচিয়ে রাখা এবং কৃষিকাজের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা সরকারের একটি মৌলিক দায়িত্ব। সেচপাম্পের মতো অপরিহার্য যন্ত্র চুরির দায় কৃষকের উপর চাপানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডকে অবিলম্বে এই নিবর্তনমূলক বিধানটি সংশোধন করার বিষয়ে বিবেচনা করতে হবে। একইসাথে, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনকে রাতের বেলায় টহল জোরদার করে এই চোর চক্রের মূলোৎপাটন করতে হবে। কৃষকের মাঠে অন্ধকার নামলে তার দায় রাষ্ট্রের এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।

উপসংহার: কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে সেচপাম্প ট্রান্সফরমার চুরির এই ধারাবাহিক ঘটনা কৃষকদের জন্য একটি বড় সংকট তৈরি করেছে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর দ্রুত ও কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে, যাতে কৃষকরা নিরাপদে তাদের কৃষিকাজ চালিয়ে যেতে পারে এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।