ঈদযাত্রার নস্টালজিয়া: ট্রেনে চড়ে আপনজনের কাছে ফেরার অমূল্য স্মৃতি
ঈদযাত্রার নস্টালজিয়া: ট্রেনে চড়ে ফেরার স্মৃতি

ঈদযাত্রার নস্টালজিয়া: ট্রেনে চড়ে আপনজনের কাছে ফেরার অমূল্য স্মৃতি

আবুল হায়াতের লেখায় উঠে এসেছে ঈদে গ্রামের বাড়িতে ফেরার এক মর্মস্পর্শী চিত্র। সারাবছর পর ছুটিতে আপনজনের কাছে যাওয়ার এই যাত্রা পাখির নীড়ে ফেরার মতোই প্রাণবন্ত। তিনি বলেন, "আমরা সারা বছর পর ছুটিতে গ্রামের বাড়ির দিকে আপনজনের কাছে যাই কত প্রকারের সব উপহার নিয়ে, তার হিসাব নেই।" ঈদুল ফিতর ও কোরবানি ঈদে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগির এই আকুলতা সবার মধ্যেই দেখা যায়।

ছুটির আকাঙ্ক্ষা ও যাত্রার চ্যালেঞ্জ

ছুটি যত বড়ই হোক, তা মন ভরাতে পারে না। প্রায় সবার মধ্যেই আরও দুদিন বেশি ছুটির ইচ্ছা জাগে। ছুটি শেষ হলেও অনেকে ওভার স্টে করে, যা কাজে ফিরতে সময় নেয়। এই নীড়ে ফেরার যাত্রায় প্রধান বাহন হলো বাস, ট্রেন ও লঞ্চ। হাজার হাজার মানুষ টিকিটের জন্য প্রতিযোগিতায় নামে, সময়মতো টিকিট কেনা যাত্রীরা নির্বিঘ্নে স্থান পেলেও দেরি করা মানুষগুলো বাহনের ছাদে বা পাদানিতে যাত্রা করে।

আবুল হায়াত বলেন, "এসবই নীড়ে ফেরা পাখির আনন্দে—আপন কুলায় পৌঁছানোটাই প্রধান লক্ষ্য।" সেখানে অপেক্ষায় থাকে পিতা-মাতা, ভাই-বোন, স্ত্রী-সন্তান বা আত্মীয়স্বজন। তাঁর নিজেরও ঈদে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার ইজান গ্রামে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও নানা কারণে তা হয়ে ওঠে না।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শৈশবের ট্রেন যাত্রার স্মৃতি

গেলে তিনি ট্রেনেই যেতেন, কারণ এটি তাঁর অতি প্রিয় বাহন। ছোটবেলা থেকেই ট্রেনের ভক্ত তিনি, কারণ তাঁর আব্বা রেলে চাকরি করতেন। বছরে ছয়বার ফ্রি পাস ও স্টুডেন্ট পাস পাওয়া যেত। তিনি বলেন, "কী মজা যে পেতাম ট্রেনে চড়তে।" আব্বার ওয়েলফেয়ার সেকশনে চাকরি থাকায় টাইম-টেবিল বাসায় আসত, যা তিনি সঙ্গে নিতেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ট্রেন চলা শুরু করলে কয়লার ইঞ্জিনের শব্দে তিনি টাইম-টেবিল নিয়ে বসতেন। রিজার্ভ করা সেকেন্ড ক্লাসে যাতায়াত করতেন, আগে ইন্টার ক্লাস ছিল যা এখন উঠে গেছে। স্টেশন আসলে টাইম স্কেলে মিলিয়ে নিতেন, তারপর টেলিফোনের পোল গোনা শুরু হতো। কয়টা পোল হলে এক মাইল হয়, তা মুখস্থ ছিল—আব্বার হাতঘড়ি দেখে ট্রেনের স্পিড বের করতেন।

যাত্রার আনন্দ ও পরিবারের সঙ্গে সময়

পাখির নাম লিখতেন খাতায়, যা বন্ধুদের কাছে বাহাদুরি নেওয়ার জন্য। জানালা খুলে বসে থাকতে হতো, যদিও আম্মা ধুলা বা কয়লার জন্য বকাবকি করতেন। ট্রেনে উঠেই আব্বা ক্যাফেটেরিয়ায় খাবারের অর্ডার দিতেন—চা-নাশতা বা মাংসের কাটলেট, যা তাঁর পছন্দ ছিল না। চায়ে পাউরুটি ভিজিয়ে খেয়ে শখ মেটাতেন, আর অপেক্ষা করতেন স্টিমারে ডিনারের জন্য।

মুরগির রানটা আব্বা তাঁর পাতেই দিতেন, একমাত্র ছেলে হওয়ার সুবিধা নেওয়া হতো। ট্রেনে ভিড় তখনও ছিল, এখনও আছে। তখন দেশে কম মানুষ ছিল, ট্রেনের সংখ্যাও কম ছিল। এখন এক্সপ্রেস, মেইল, কমিউটার ট্রেন বেড়েছে, লোকবল বহুগুণ বেশি। তবু মানুষ ট্রেন যাত্রাই পছন্দ করে, কারণ এটি নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও উপভোগ্য

দেশের সৌন্দর্য উপভোগ ও রেলের মজা

জানালায় বসে বাইরের দৃশ্য দেখলে আনন্দে বুক ভরে যেত। শস্যখেত, কৃষকের হাল চষা, ফসল কাটা, পাখির ঝাঁক, নদীতে নৌকা বাওয়া—সবই দেশের সৌন্দর্য বোঝাতে সাহায্য করত। তিনি বলেন, "আহা, গা-টা শিউরে ওঠে আমার।" তাঁর লেখায় রেলের প্রতি পক্ষপাতিত্ব স্বীকার করেন, কারণ রেলের মানুষ হিসেবে এটি স্বাভাবিক।

পানিকে ভয় পেলে বাসে দম বন্ধ লাগলেও রেলে চড়ার মজা আলাদা। "রেল গাড়ি ঝমাঝম/ পা পিছলে আলুর দম"—এই ছড়া ট্রেনের শব্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গাইতেন। ডিজিটাল যুগে এসে এই আনন্দ মলিন হতে হতে বিলুপ্ত হয়ে আসছে, তরুণ-তরুণীরা এখন টিকটকে মজা করে। তবু এটাও এক আনন্দ, তবে নির্মল রাখার চেষ্টা করা উচিত।

রেলের ইতিহাস ও একটি মজার গল্প

ভারতবর্ষে ট্রেন এসেছিল ১৮৫৩ সালে, ইলেকট্রিক ট্রেন চালু হয় ১৯২৫ সালে বোম্বেতে (এখন মুম্বাই)। আগের ট্রেন ঢিমেতালে চলত, ইলেকট্রিক ট্রেন দ্রুত ছুটত। একটি গল্প শোনান: এক ভদ্রলোক পরিবারকে স্টেশনে উঠিয়ে দিচ্ছিলেন, ছুটি না পাওয়ায় যেতে পারছিলেন না। ট্রেন ছাড়ার সময় বাচ্চা কাঁদছিল, বাবা সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন। যখন চুমু দিতে গেলেন, ট্রেন হুশ করে ছুটে গেল—চুমুটি গিয়ে পড়ল দুই সিট পরে বসা আরেকজনের গালে!

ঈদ মোবারক। সবাইর ঈদযাত্রা শুভ, নিরাপদ ও আনন্দে ভরপুর হোক।