বিশ্ব পথশিশু দিবসে ইয়াসিনের আকুতি: 'মা-বাপেরে চাইমু, স্কুলে যাইতে মন চায়'
‘আলাদিনের চেরাগ পেলে দৈত্যের কাছে কী চাইতে?’ এই প্রশ্নের উত্তরে কমলাপুর রেলস্টেশনের শিশু ইয়াসিনের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় এক মর্মস্পর্শী আকুতি। গত শুক্রবার স্টেশনে কথা হয় তার সঙ্গে। ইয়াসিন বলে, ‘মা–বাপেরে চাইমু, আর কিছু না। মা–বাপেরে কাম কইরা খাওয়ামু। আবার মা আমারে ভাত বাইড়া দিবো, এইডাও চাইমু।’
ইয়াসিনের জীবনযুদ্ধ: স্টেশনেই ঠাঁই, স্কুলে যাওয়ার স্বপ্ন
ইয়াসিনের বয়স ১২ বছর। তার বাবা মো. কালাম ও মা মোছা. শারমিনের ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর থেকে কমলাপুর রেলস্টেশনই তার ঘর। মা পোশাক কারখানায়, বাবা ভাঙারির দোকানে কাজ করতেন। কিন্তু এখন ইয়াসিনকে রাখতে চান না তাঁরা। ইয়াসিন স্কুলে যায় না; স্টেশনে যাত্রীদের ব্যাগ টেনে দিনে ৩০–৪০ টাকা আয় করে, যা দিয়ে তার খাওয়া চলে। তবু তার ইচ্ছা জাগে: ‘কয়দিন মজার স্কুলে গেছি। স্কুল যাইতে মন চায়। কে নিয়া যাইবো?’
বিশ্ব পথশিশু দিবস ও উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান
আজ ১২ এপ্রিল, বিশ্ব পথশিশু দিবস। দেশে ইয়াসিনের মতো পথশিশুর সঠিক সংখ্যা অজানা, কিন্তু ইউনিসেফের ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ন্যূনতম ৩৪ লাখ পথশিশু রয়েছে। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের ‘পথশিশুদের ওপর জরিপ ২০২২’ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য:
- পথশিশুদের গড় বয়স ১২.৩ বছর।
- একজন মেয়েপথশিশুর বিপরীতে চারজন ছেলেপথশিশু আছে।
- ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি, সাড়ে ৪৮ শতাংশ পথশিশুর বসবাস, যার মধ্যে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় ৪১ শতাংশ।
- এই শিশুদের প্রতি চারজনের তিনজন পড়তে বা লিখতে পারে না।
কাজের চাপ ও সহিংসতা: নয়ন ও সাইদুলের গল্প
কমলাপুর রেলস্টেশনেই নয়নের (১৬) সঙ্গে দেখা হয়। সে রাস্তায় পানি বিক্রি করে, কিন্তু দুই সপ্তাহ আগে তার পানি চুরি হয়ে যাওয়ায় স্টেশনেই আটকে আছে। নয়ন বলে, ‘আমার বাপ–মা আছে। ম্যালাজনের বাপ–মাও নাই। পানির ট্যাকা জোগাইতে বোঝা মারতেছি। টাকা জোগাড় হইলে বাড়ি যামু।’ ইউনিসেফের জরিপে দেখা যায়, ৯১ শতাংশ পথশিশু কাজ করে, যাদের মধ্যে ২০.৯ শতাংশ বর্জ্য সংগ্রহ, ১৮.৪ শতাংশ ভিক্ষাবৃত্তি করে। একজন পথশিশু সপ্তাহে ১ হাজার টাকার কম আয়ে ৩০ থেকে ৪০ ঘণ্টা কাজ করে, এবং ৫০ শতাংশ সহিংসতার শিকার হয়, প্রধানত পথচারীদের হাতে।
পুরানা পল্টনের শিশু সাইদুল (১২) ছোটবেলায় ট্রেনে চড়ে কুমিল্লা থেকে ঢাকায় চলে আসে। এখন সে বোতল কুড়ানো ও ভিক্ষা করে, দিনে এক বেলা খেতে পায়। সাইদুল বলে, ‘যেহানে পাই, ওই হানেই ঘুমাই। মাইনষ্যে লাথি মারে। উঠায় দেয়। বৃষ্টির সময় বেশি কষ্ট হয়।’ জরিপে দেখা যায়, ৩০ শতাংশ পথশিশু খোলা জায়গায় থাকে, ৭ শতাংশ একা ঘুমায়, এবং ৩০.৪ শতাংশ সহিংসতা রাতে ঘুমের সময় ঘটে। সাইদুলের আকুতি: ‘ভাইয়া, আমারে বাড়ি পৌঁছায় দেন। বাড়ি কুমিল্লার মুরাদনগর। আমারে নিয়া গেলে চিনতে পারমু। আমি স্কুলে যামু, নেশা–পানিও করমু না।’
মাদকের ছোবল: ফাতেমা ও শুভদের দল
পুরানা পল্টনে শুভ, মিম, ফাতেমা, হাসান, সালাউদ্দিনদের দল পলিথিনে মুখ ঢুকিয়ে ডেন্ডি সেবন করে। ফাতেমার বয়স মাত্র ৯ বছর; বোতল কুড়িয়ে দিনে ২৫০ টাকা আয় করে, ভিক্ষাও করে, কিন্তু আয়ের বড় অংশ যায় ডেন্ডি কিনতে। ফাতেমা বলে, ‘বোতল টোকায়া ভাত খাই। ভিক্ষাও করি। ডেন্ডি খাইতে চাই না। কিন্তু না খায়া ভালো লাগে না। মাঝে মাঝে খাই।’ বিবিএস ও ইউনিসেফের জরিপে উল্লেখ করা হয়, ১২ শতাংশ পথশিশু মাদকে আসক্ত, এবং প্রায় ২৫ শতাংশ ধূমপান করে।
সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি ও সমাধানের পথ
লোকাল এডুকেশন অ্যান্ড ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (লিডো) প্রতিষ্ঠাতা ফরহাদ হোসেন জানান, ঢাকায় প্রায় আড়াই লাখ পথশিশু রয়েছে, কিন্তু সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি সহানুভূতিশীল নয়। তিনি বলেন, ‘তাদেরকে অপরাধী হিসেবে দেখা হয়। মানুষ মনে করে তারা মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু এটি সত্যি নয়। দু–একজন টিকে থাকার খাতিরে হয়তো এসবে জড়িয়ে পড়ে। সেই দোষটা সব শিশুর ওপরে এসে পড়ে।’ তিনি বেসরকারি সংস্থা ও সরকারের আন্তরিকতা জোরালোভাবে দাবি করেন, বিশেষত অর্থ বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে।
বিশ্ব পথশিশু দিবসে ইয়াসিন, নয়ন, সাইদুল, ফাতেমার গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই শিশুদের প্রতি সহমর্মিতা ও কার্যকরী পদক্ষেপ এখনই জরুরি।



