ফরিদপুরে দুই যুগ ধরে দলবদ্ধভাবে ঘুরছে অর্ধশত গুইসাপ
ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলায় একটি অনন্য দৃশ্য দেখা যাচ্ছে, যেখানে প্রায় দুই যুগ ধরে দলবদ্ধভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে অর্ধশত বিশালাকৃতির গুইসাপ। প্রথম দর্শনে এগুলোকে কুমির ভেবে ভুল হতে পারে, কিন্তু আসলে এরা বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী গুইসাপ, যা মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক
সদরপুর বাজারসংলগ্ন একটি জলাশয়ের তীরজুড়ে অবাধে বিচরণ করছে প্রায় ৪০ কেজি ওজনের এই গুইসাপগুলো। তারা দলবদ্ধ হয়ে ময়লার ভাগাড়, ঝোপঝাড়, বাজার এবং বাড়ির উঠানে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়। স্থানীয়রা জানান, গুইসাপগুলো মানুষের কোনো ক্ষতি করে না, বরং বাজারের ময়লা-আবর্জনা খেয়ে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে সহায়তা করে।
বাজারের পরিচ্ছন্নকর্মী চন্দন বলেন, "গুইসাপগুলো ময়লা আবর্জনা খেয়ে আমার পরিশ্রম কমিয়ে দেয়। এতে বাজারের দুর্গন্ধও কমে।" ব্যবসায়ী সুজন শেখ যোগ করেন, "তারা মানুষের ক্ষতি করে না, তাই কেউ তাদের তাড়ায় না। এখন সবাই তাদের উপকারী বন্ধু মনে করে।"
বংশবিস্তার ও সংখ্যা বৃদ্ধি
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় দুই যুগ আগে এখানে মাত্র দুই-চারটি গুইসাপ দেখা গেলেও বংশবিস্তারের মাধ্যমে এখন তাদের সংখ্যা প্রায় অর্ধশতে পৌঁছেছে। স্থানীয় বাসিন্দা মো. লাবলু বলেন, "প্রাণীগুলো দেখতে কুমিরের মতো, কিন্তু তারা শুধু পচা-গলা খাবার খায়। হাঁস-মুরগি বা অন্য কোনো জীবের ক্ষতি করে না, তাই মানুষের সঙ্গে তাদের বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে।"
পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
প্রাণিসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গুইসাপ শান্ত স্বভাবের প্রাণী, যা দিবাচর এবং সাধারণত মাটির গর্ত বা পরিত্যক্ত স্থানে বাস করে। তারা বিষধর সাপের ডিম, মৃত মাছ, ব্যাঙ, কাঁকড়া এবং পচা প্রাণী খেয়ে বেঁচে থাকে, যা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক।
ফরিদপুর পরিবেশ উন্নয়ন ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান বলেন, "গুইসাপ পরিবেশের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এদের সংখ্যা কমে যাওয়ায় ক্ষতিকর পোকামাকড় ও সাপের সংখ্যা বাড়ছে। তাই এদের সংরক্ষণ জরুরি।"
প্রশাসনের সাড়া ও সংরক্ষণ উদ্যোগ
সদরপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সব্যসাচী মজুমদার জানান, গুইসাপগুলোর শরীরে ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে, তাই কামড় বা আঘাতের ক্ষেত্রে ইনফেকশন হতে পারে, কিন্তু তারা সাধারণত নিরীহ। তিনি বলেন, "ধানখেতের ইঁদুর ও পোকামাকড় খেয়ে গুইসাপ কৃষকের বন্ধু। এদের সংরক্ষণের দায়িত্ব বন বিভাগের।"
ফরিদপুরে সহকারী বন সংরক্ষক তাওহীদ হোসেন বলেন, "আমরা সরেজমিন গিয়ে দেখব এবং সংরক্ষণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাবনা পাঠাব।" সদরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শরিফ শাওনও প্রাণীগুলোর নিরাপদ বসবাস নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছেন।
এই ঘটনা ফরিদপুরে প্রাকৃতিক সম্পদ ও বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরছে, যা স্থানীয় সম্প্রদায়ের সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে।



