নারী ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৯তম, দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় সর্বনিম্ন
নারী ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ ১৭৯তম, দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় সর্বনিম্ন

বিশ্বব্যাংকের newly প্রকাশিত 'ওমেন, বিজনেস অ্যান্ড দ্য ল ২০২৬' প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নারীদের অর্থনৈতিক সুযোগ ও অধিকার নিশ্চিতে বাংলাদেশের অবস্থান ১৯০টি দেশের মধ্যে ১৭৯তম স্থানে নেমে এসেছে। এক বছর আগেও বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৭৬তম এবং ২০২২ সালে ছিল ১৭৩তম।

দক্ষিণ এশিয়ায় নারী ক্ষমতায়নের চিত্র

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নারী ক্ষমতায়নে সেরা অবস্থানে রয়েছে ভারত, যার বৈশ্বিক অবস্থান ১২৯তম। এরপরই রয়েছে নেপাল (১৩০), ভুটান (১৩৯), শ্রীলঙ্কা (১৫৯) এবং পাকিস্তান (১৬৩)। বাংলাদেশ রয়েছে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন অবস্থানে, আর সবশেষে রয়েছে আফগানিস্তান।

বাংলাদেশের দুর্বলতা কোথায়?

প্রতিবেদনটি শুধু আইন নয়, বরং নারীরা কতটা অর্থনৈতিক সুযোগ পাচ্ছেন, তারা কীভাবে ব্যবসা করতে পারছেন, সম্পদের মালিক হতে পারছেন, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা পাচ্ছেন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কতটা সহায়তা দিচ্ছে, তা মূল্যায়ন করে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নারী ক্ষমতায়নের জন্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি রয়েছে—আইনি সমতা, সহায়ক প্রতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন। তিনটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ দুর্বল।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রতিবেদন অনুসারে, নারীদের জন্য আইনি কাঠামোয় বাংলাদেশের স্কোর ৩৪.৩৮, সহায়ক কাঠামোয় ৩৪.৭৩ এবং আইন বাস্তবায়নে মাত্র ২৭.৯২। অর্থাৎ কাগজে-কলমে যে অধিকারগুলো রয়েছে, তার একটি বড় অংশ বাস্তবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট

ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার উন্নত দেশগুলোর গড় স্কোর প্রায় ৮৮, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার গড় স্কোর প্রায় ৪৫। ফলে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল অঞ্চলগুলোর একটিতে নারীদের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার একটি বড় অংশ অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, দক্ষিণ এশিয়া যদি নারীদের পূর্ণ অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে অঞ্চলটি তার সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধির একটি বড় অংশ হারাবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নারীরা যেসব বাধার মুখোমুখি

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারীদের জন্য পুরুষদের তুলনায় ব্যবসা শুরু করা, ব্যাংক ঋণ পাওয়া, সম্পত্তির মালিক হওয়া বা কর্মক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার গড়া এখনও বেশি কঠিন। নতুন উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় বাধা হলো জামানতের অভাব। বেশিরভাগ নারীর নিজ নামে পর্যাপ্ত সম্পদ নেই, ফলে ব্যাংক ঋণ পেতে পিছিয়ে পড়েন। অনেক ক্ষেত্রে আর্থিক প্রতিষ্ঠান নারী উদ্যোক্তাদের ঝুঁকিপূর্ণ গ্রাহক হিসেবে বিবেচনা করে।

অন্যদিকে কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি, নিরাপত্তাহীনতা, সীমিত মাতৃত্বকালীন সুবিধা, শিশু যত্ন কেন্দ্রের অভাব এবং সমান বেতনের দুর্বল বাস্তবায়নও নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ কমিয়ে দেয়।

ডিজিটাল উদ্যোক্তাদের উত্থান

কোভিড-১৯ মহামারির পর দেশে অনলাইন ব্যবসা ও ই-কমার্স খাতে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সামাজিক মাধ্যমভিত্তিক ব্যবসা, হোম ডেলিভারি সেবা, হস্তশিল্প ও খাদ্য বিক্রির মাধ্যমে হাজার হাজার নারী আত্মনির্ভর হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। তরুণ উদ্যোক্তা হাসিন ফেরদৌসির মতে, ডিজিটাল প্রযুক্তি নারীদের জন্য নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। কিন্তু আর্থিক সহায়তা, নিরাপত্তা এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগের অভাবে অনেক উদ্যোক্তা একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ের পর এগোতে পারেন না। তিনি মনে করেন, নারীদের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন, ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং বাজার সংযোগ নিশ্চিত করা গেলে অর্থনীতিতে তাদের অবদান আরও বাড়বে।

জিডিপিতে নারীদের ভূমিকা

বিশ্বব্যাংকের গবেষণা বলছে, শ্রমবাজারে লিঙ্গ বৈষম্য কমালে অনেক দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বাড়তে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, নারীরা দেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ যদি পূর্ণ সম্ভাবনায় অর্থনৈতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে না পারে, তাহলে জাতীয় উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধি স্বাভাবিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, নারীদের উৎপাদনশীলতা ও আয় বাড়ানো সরাসরি জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এর জন্য ব্যাংক ঋণ, আর্থিক প্রণোদনা, ডিজিটাল লেনদেন এবং উদ্যোক্তা সহায়তা সহজলভ্য করতে হবে।

সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধা

নারী অধিকার কর্মীরা মনে করেন, সমস্যার মূল কারণ শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিকও। নারীরা দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যের শিকার হলেও অনেক ক্ষেত্রে তারা এটিকে স্বাভাবিক বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন। সাবেক নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরিন পারভীন হক বলেন, নারীদের আইনি ও সামাজিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। লিঙ্গ সমতার বিষয়ে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও বাস্তব পদক্ষেপ ছাড়া টেকসই পরিবর্তন সম্ভব নয়। তাঁর মতে, বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে নারী ক্ষমতায়নের পথ অনেক সহজ হতো।