বব ডিলানের স্মৃতি ও ফারগোর বাফেলো উইংস: এক স্মৃতিচারণ
বব ডিলানের স্মৃতি ও ফারগোর বাফেলো উইংস

সংগীত কিংবদন্তি বব ডিলানের সঙ্গে আমার কখনও দেখা হয়নি। তবে অদ্ভুত কাকতালীয় যোগসূত্রে আমেরিকার মিডওয়েস্টের এমন দু-একটি জায়গায় আমার যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল, যেখানে একসময় তিনি তার স্মৃতির স্বাক্ষর রেখে গেছেন।

মিনিয়াপোলিসের স্মৃতি

আজ থেকে প্রায় বাইশটি বসন্ত আগে, আমার দ্বিতীয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় এক অধ্যাপকের সঙ্গে দেখা করতে মিনিয়াপোলিসের ইউনিভার্সিটি অব মিনেসোটায় গিয়েছিলাম। এই সেই ঐতিহাসিক বিশ্ববিদ্যালয়— যেখানে ১৯৫৯ সালের সেপ্টেম্বরে বব ডিলান ভর্তি হয়েছিলেন। যদিও সংগীতের প্রতি তীব্র টানে পরের বছর মে মাসেই প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার পাট চুকিয়ে দেন তিনি।

আমার সেই একাডেমিক আলোচনা শেষ করে আমি মিনিয়াপোলিস ছেড়ে নর্থ ডাকোটার সুন্দর শহর ফারগোতে কয়েক দিন কাটানোর সিদ্ধান্ত নিই। ফারগোতে কাটানো সেই দিনগুলোতে আমি পুরো শহর চষে বেড়াতাম, আর সন্ধ্যায় ফিরে আসতাম আমার আস্তানায়— ৪২ নম্বর স্ট্রিট এবং ১৩ নম্বর অ্যাভিনিউয়ের উত্তর-পশ্চিম কোণে অবস্থিত আরামদায়ক ‘কেলি ইন’ লজে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ডিলানের ফারগো অধ্যায়

১৯৫০-এর দশকের শেষের দিকে বব ডিলান তার সংগীত জীবনের গঠনমূলক সময়ের একটি অংশ কাটিয়েছিলেন এই ফারগো শহরেরই ডাউনটাউন এলাকায়। তখন তার নাম ছিল রবার্ট জিমারম্যান বা সংক্ষেপে ‘জিমি’। কিশোর ডিলান ফারগোতে এসে তার সামার ক্যাম্পের বন্ধু রন জোয়েলসনের বাড়ির এক অর্ধ-সমাপ্ত চিলেকোঠায় থাকতেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ফারগোতে সপ্তাহব্যাপী অবস্থানের সময় আমি সেই এলাকাগুলো ঘুরে দেখার সুযোগ পাই, যেখানে তরুণ এই চারণকবি তার প্রতিভার ছাপ রেখেছিলেন। এর মধ্যে ছিল ‘দ্য রেড অ্যাপল ক্যাফে’ (যা পরে ব্যাব’স কফি হাউস নামে পরিচিত হয়), যেখানে ডিলান কিছুদিন টেবিল বয় এবং থালাবাসন মাজার কাজ করেছিলেন। আরও ছিল ঐতিহাসিক ‘বাইসন হোটেল’— যেখানকার লাউঞ্জে তিনি আড্ডা দিতেন। বর্তমানে সেই হোটেলের দেয়ালে বব ডিলানের আড়াই তলা সমান এক বিশাল ম্যুরাল শোভা পাচ্ছে। এছাড়াও ছিল ‘স্যামস রেকর্ড ল্যান্ড’ নামের একটি মিউজিক শপ, যেখানে পিয়ানো বাজানোর অডিশন দিয়ে ডিলান ১৯৫০-এর দশকের ফারগোর বিখ্যাত টিনএজ রক অ্যান্ড রোল ব্যান্ড ‘দ্য শ্যাডোস’-এ সুযোগ পেয়েছিলেন।

এই নোবেলজয়ী সংগীত লিজেন্ডের ফারগো অধ্যায়টি সংক্ষিপ্ত হলেও, তা ছিল তার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক স্টপেজ। এখান থেকেই সেই শরতে তিনি ইউনিভার্সিটি অব মিনেসোটা এবং পরবর্তী সময়ে ১৯৬০-এর বসন্তে নিউইয়র্কের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান।

ফারগোর বর্তমান চিত্র

ফারগোতে আমার কাটানো সময়গুলো ছিল ভীষণ চমৎকার। কেলি ইন লজটি শহরের এক ব্যস্ত প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ছিল। এর ঠিক পাশেই ছিল আমার সন্ধ্যার প্রিয় ঠিকানা— বিখ্যাত ‘গ্র্যান্ডমাস সেলুন অ্যান্ড গ্রিল’। আর রাস্তার ওপারেই ছিল নর্থ ডাকোটার সবচেয়ে বড় শপিং মল ‘ওয়েস্ট অ্যাক্রেস মল’।

একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে এই সংযোগস্থলটি ওই অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়। ২০০৪ সালের মধ্যে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের সেই কাঁচা ও পিচহীন রাস্তাগুলোর রূপ সম্পূর্ণ বদলে যায়। এলাকাটি তখন পরিণত হয়েছে ফারগোর প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্রে, যেখানে সারি সারি শপিং মল, গ্যাস স্টেশন আর নামী-দামী ফাস্ট-ফুডের দোকান গড়ে উঠেছে।

ফারগো শহরটি তার প্রাণবন্ত ওয়াইন ও আর্ট কালচার, চমৎকার সব শৌখিন দোকান, আরামদায়ক ক্যাফে এবং মিডওয়েস্টের সমৃদ্ধ ইতিহাসের জন্য পরিচিত। নর্দার্ন প্যাসিফিক রেলপথ যেখানে রেড রিভারকে স্পর্শ করেছে, সেখান থেকেই মূলত এই ঔপনিবেশিক জনপদের সূচনা। উর্বর কৃষিজমির কারণে এই সীমান্ত শহরটি দ্রুত মানুষের পছন্দের গন্তব্যে পরিণত হয়। ১৮৭৬ সালে যেখানে এখানকার জনসংখ্যা ছিল মাত্র ৬০০, সেখানে ২০০৪ সালে আমার পরিদর্শনের সময় তা প্রায় ১ লাখে গিয়ে ঠেকেছিল।

কেলি ইন লজটিকে কেন্দ্র বানিয়ে আমি নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি, ইটাসকা স্টেট পার্ক এবং লেক ইটাসকা থেকে উৎপন্ন মিসিসিপি নদীর উৎসের মতো দূর-দূরান্তের দর্শনীয় স্থানগুলোতে ঘুরে বেড়িয়েছি।

পরিবর্তনের ছোঁয়া

আজ অবশ্য সেই মোড়ে কেলি ইন লজ বা সেই জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ— কোনোটিরই আর অস্তিত্ব নেই। সেগুলোর জায়গা দখল করে নিয়েছে ‘ওয়ালগ্রিনস’ নামের এক ওষুধের দোকান। কেলি ইন লজটির নাম পরিবর্তন করে অন্য জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, আর ‘গ্র্যান্ডমাস’ রেস্তোরাঁটি চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে।

তবে গ্র্যান্ডমাসের তুমুল জনপ্রিয় বাফেলো উইংসের স্বাদে আমি পুরোপুরি কুপোকাত হয়ে পড়েছিলাম। প্রতি সন্ধ্যায় সেখানে গিয়ে আমি সবার আগে এক প্লেট আনব্রেডেড চিকেন উইংসের অর্ডার দিতাম। মুচমুচে করে ডিপ-ফ্রাই করা সেই উইংসগুলো ভিনেগার-ভিত্তিক লাল মরিচের হট সস এবং গলানো মাখনের এক সিগনেচার সসে ডুবানো থাকতো। তাদের পরিবেশনশৈলীও ছিল অনন্য; সাধারণ প্লেটে প্লাস্টিকের কাপে ড্রেসিং দেওয়ার বদলে তারা তাদের ঘরে তৈরি এক বিশাল পেঁয়াজের রিংয়ের (অনিয়ন রিং) ঠিক মাঝখানে ঘন ব্লু-চিজ ড্রেসিং ঢেলে দিতো এবং পাশে সাজিয়ে রাখতো মচমচে সেলেরি ও গাজরের টুকরো।

ক্লাসিক ভিনেগারি হট সস হোক, কিংবা লুইজিয়ানা ধাঁচের ঝাল সস অথবা গ্র্যান্ডমাসের নিজস্ব ‘হানি বার্বিকিউ’— সব ধরনের সস উইংসগুলোর গায়ে এমনভাবে লেগে থাকতো যে মাংসের মচমচে ভাব একটুও নষ্ট হতো না। ছুটির দিনের গভীর রাতে ঠান্ডা ড্রাফট বিয়ারের চুমুকের সঙ্গে সেই বাফেলো উইংসের স্বাদ— ফারগোতে কাটানো আমার দিনগুলোর এক অবিচ্ছেদ্য ও চিরস্মরণীয় স্মৃতি হয়ে থাকবে।

লেখক: সম্পাদক, ঢাকা ট্রিবিউন