অভাবের দিনে বুড়ি মুরগির গল্প: এক স্মৃতি
অভাবের দিনে বুড়ি মুরগির গল্প

ছবি: এআই/বন্ধুসভা

কেমন অভাবে তখন দিন কাটত, তা এখন মনে করলে শরীর ঝিমঝিম করে ওঠে। এক বেলা খেলে আরেক বেলা খাই না, সকালে খেলে দুপুর–রাতে খবর নেই। এমনও দিন গেছে, টানা দুই দিন আমাদের ঘরের চুলো আগুন দেখেনি।

আমাদের অফ হোয়াইট কালারের একটা মুরগি ছিল, সাইজে বড় এবং অন্য মুরগিগুলোর চেয়ে বয়সী হওয়ায় মা এটাকে বুড়ি ডাকত। অন্যান্য মুরগিরও এ রকম নাম ছিল; যেমন কালি, পুইট্টা, ফুটফুডি, ল্যাংড়ি ইত্যাদি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সংসারে তখন খুব অভাব। কেমন অভাবে তখন দিন কাটত, তা এখন মনে করলে শরীর ঝিমঝিম করে ওঠে। এক বেলা খেলে আরেক বেলা খাই না, সকালে খেলে দুপুর–রাতে খবর নেই। এমনও দিন গেছে, টানা দুই দিন আমাদের ঘরের চুলো আগুন দেখেনি। আব্বার দীর্ঘদিনের প্যারালাইজড জীবন আমাদের পারিবারিক বিপর্যয়ের কারণ।

সময়টা ’৯৩–’৯৪ হবে হয়তো। টানা দুদিন না খেয়ে আছি। আশপাশে কেউ জানে কেউ জানে না। প্রথম প্রথম পাশের আত্মীয়রা সহযোগিতা করলেও অভাব আমাদের ঘরে স্থায়ী হয়ে যাওয়ায় তারাও পিছিয়ে যায়। আমরা ছয় ভাইবোন এবং বড় ভাইয়ের সংসারের পাঁচজনসহ আমাদের তখন ১২ জনের সংসার।

এ ধরনের তীব্র অভাবে আমাদের ভেতর তেমন কোনো যন্ত্রণা বা হাহুতাশ নেই। অর্থাৎ অভাবের যন্ত্রণায় কোনো চিৎকার বা চেঁচামেচি নেই। কারও বিরুদ্ধে কারও অভিযোগ নেই। আমি সব দিক দিয়েই মেজ, মানে বড় দুই বোন, ছোট দুই বোন, বড় এক ভাই, ছোট এক ভাই। অভাবের কারণে এবং আব্বা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ায় আমার ছোট ভাইটা লাইনচ্যুত হয়ে পড়ল। এটাই আমাদের অভাবী পরিবারের একমাত্র পরাজয়!

এ রকম অভাবী দিনের একটা ঘটনা। আমরা দুই দিন না খেয়ে আছি, ঘরে কিছুই নেই। খেয়াল করলাম আমাদের বুড়ি মুরগিটা ঝিমাচ্ছে এবং সাদা সাদা পায়খানা করছে। এর কারণ আবিষ্কার করলাম, বুড়ির ভেতরে ডিম ভেঙে গেছে। বুড়ির একটা কৃতিত্ব ছিল দুই কুসুমের ডিম পাড়া এবং সে একটানা অনেক দিন ডিম পাড়ত বলে আমার মায়ের বিশেষ স্নেহপুষ্ট ছিল।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

যাহোক, বুড়ি অসুখে পড়ে গেছে! হয়তো সুস্থ না–ও হতে পারে এই অজুহাতে বুড়িকে জবাই করার প্রস্তাব দিলাম মাকে। মা ভীষণ মন খারাপ করে মিনমিন করে বলল, ‘যা মন চায় করগা!’

চরম অভাবে আমাদের গলার স্বর সবারই খুব ক্ষীণ। সকালে বুড়িকে জবাই করেছিলাম আমি। দুপুরে ভালো খাবার খাব এ রকম প্রত্যাশা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। কোনো কাজে হয়তো ব্যস্ত হয়ে পড়ায় সেদিন দুপুরে বাসায় ফিরিনি। রাতে যখন বাসায় ফিরলাম প্রচণ্ড ক্ষুধা নিয়ে, বাসার সবাই তখন ঘুমিয়ে। আমি বোল, বাটি, থালা উল্টে দেখি আমার জন্য খাবার নেই! মিটশেফ খুলে দেখি বুড়ি আস্ত অবস্থায় বোলের মধ্যে। মাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম—‘মা রানছ না?’

মা খুব চিকন স্বরে বলল, ‘কী দিয়া রানবাম, গরো কিছু আছে?’

ছোট বোন দুটো ঘুম থেকে উঠে জানাল, মুরগি রান্নার জন্য ঘরে তেল–মসলা কিছু নেই!

আরও পড়ুন

কখনো বলিনি মা, ভালোবাসি

৪০ মিনিট আগে

আহ! ঘরে মাংস! মাংস রান্নার মসলা ঘরে নেই! এ আমরা কেমন অভাবে? কত কঠিন অভাবে আছি! তবু ঘরে চিৎকার–চেঁচামেচি নেই। কতটা সহনশীল আমাদের পরিবারের মানুষগুলো!

তখন রাত ১২টা। আমার পকেটে ২০–২৫ টাকার মতো এসেছে। কীভাবে যে টাকাগুলো পেয়েছিলাম, এখন আর মনে নেই। আমাদের পাড়ার রোসবলের দোকান তখন খোলা। ছোট বোনকে সঙ্গে নিয়ে রাতেই দোকান থেকে তেল–মসলা নিয়ে আসলাম। মা জানাল, ঘরে পোলাওয়ের চাল আছে। ঝোল ঝোল করে বুড়ির ঝাল মাংস আর পোলাওয়ের চালের ভাত রাত দেড়টায় খাচ্ছি;

আমার মায়ের হাতে সেরা রান্না!

সেই সেরা খাবারের কথা কোনো দিন ভুলব না। কোনো দিন না...

উপদেষ্টা, ময়মনসিংহ বন্ধুসভা

ফিচার থেকে আরও পড়ুন

জীবনযাপন

বন্ধুসভা ফিচার

মা দিবস