ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম হজকে ঘিরে গত প্রায় দেড় হাজার বছরে নানা রকম ঘটনা ঘটেছে। এগুলোর খুব কমই লিখিতভাবে সংরক্ষিত হয়েছে। আর যা লিখিত হয়েছে, তা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে আরব দুনিয়া, তুরস্ক, হিন্দুস্তানসহ ইউরোপ ও আফ্রিকার কিছু দেশের বিভিন্ন গ্রন্থাগার ও অভিলেখাগারে।
অল্প কিছু বই বা বইয়ের পাণ্ডুলিপিও রয়েছে যার কোনোটি প্রকাশিত, কোনোটি অপ্রকাশিত। এগুলোকে রসদ হিসেবে ব্যবহার করে গত শতক থেকে কোনো কোনো গবেষক ও ইতিহাসবিদ কয়েকশ থেকে হাজার বছর আগে কীভাবে হজ করা হতো, সে সম্পর্কে বইপত্র লিখেছেন।
ওসমানিয়া (অটোমান) সাম্রাজ্যের ইতিহাসের ওপর বিশেষজ্ঞ সুরাইয়া ফারুকীর ‘পিলগ্রিমস অ্যান্ড সুলতানস: দ্য হজ আন্ডার দ্য অটোমানস’ (হজযাত্রী ও সুলতানগণ: ওসমানিয়া আমলে হজ) শীর্ষক বইটি এরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ বই যা প্রথম ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত হয়।
এই বইতে লেখিকা ওসমানিয়া শাসনামলের ১৫১৭-১৬৮৩ সময়কালে হজের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোকপাত করেছেন।
ওসমানিয়া সাম্রাজ্যের প্রেক্ষাপট
ওসমানিয়া সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন শুরু হয় ১২৯৯ সালে আজকের তুরস্কের আনাতোলিয়ায়। ১৪৫৩ সালে দ্বিতীয় মোহাম্মদ রোমান সাম্রাজ্যের কনস্টান্টিনোপল জয় করার মধ্যে ওসমানিয়া সাম্রাজ্যের শক্ত ভিত্তি দাঁড়িয়ে যায়।
এরপর আরও অন্তত দুই দশক এই সাম্রাজ্য ইউরোপের পূর্বাংশ, আরব উপদ্বীপ ও পূর্ব আফ্রিকা জুড়ে বিস্তৃতি লাভ করে। হেজাজও ওসমানিয়া শাসনাধীনে চলে আসায় মক্কা ও মদিনার মতো পবিত্র দুই নগরীও এই সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে। ফলে ইসলামের ইতিহাসে ওসমানিয়া সাম্রাজ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় হয়ে ওঠে। ওসমানিয়া শাসকরা মূলত সুলতান হিসেবে পরিচিত ছিলেন। যদিও পরবর্তীকালে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মুসলমানরা অনেকেই তাঁদেরকে খলিফা ও ওসমানিয়া সাম্রাজ্যকে ওসমানিয়া খিলাফত হিসেবে অভিহিত করেছেন।
হজের চ্যালেঞ্জ ও ব্যবস্থাপনা
ওসমানিয়া আমলে তথা মধ্যযুগে হজের জন্য মক্কায় সফর করা ছিল একধারে দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ, বেশ কষ্টকর ও বিপদসংকুল। মূলত ইস্তাম্বুল থেকে আলেপ্পো ও দামেস্ক হয়ে তিন হাজার কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়ে হজের কাফেলা আসত মক্কায়।
হজযাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণসহ তাঁদের জন্য খাদ্য, পানীয় ও বিশ্রামাগারের ব্যবস্থা করা ওসমানিয়া সাম্রাজ্যভুক্ত প্রাদেশিক প্রশাসকদের জন্য ছিল বিরাট এক চ্যালেঞ্জ। ইস্তাম্বুল থেকে সুলতানের নানা আদেশ-নির্দেশ জারি হয়েছে, প্রাদেশিক প্রশাসকরা তার ভিত্তিতে চিঠিপত্র চালাচালি করেছেন। এসব দলিলাদির অনেক কিছু সংরক্ষিত আছে কালের আঘাত সয়ে।
সুরাইয়া ফারুকী এসব দলিলাদি এবং সমসাময়িককালে হজ সফরের বিভিন্ন বিবরণী ব্যবহার করে তাঁর এই বইটি রচনা করেছেন। ভূমিকা ও উপসংহারসহ বইটি মোট নয়টি অধ্যায়ে বিভক্ত।
বইয়ের অধ্যায়সমূহ
মূল অধ্যায়গুলো হলো: প্রাক-ওসমানিয়া আমলে মক্কার হজযাত্রীরা, কাফেলার পথগুলো, কাফেলার নিরাপত্তা, পবিত্র নগরীগুলোর অর্থায়ন, শাসক ও ধর্মের প্রশংসা: মক্কা ও মদিনার গণভবনগুলো, বিদেশনীতি হিসেবে হজযাত্রীরা এবং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে হজযাত্রীরা।
বইটি প্রথমে জার্মান ভাষায় প্রকাশিত হয়েছিল। ইংরেজিতে ভাষান্তরের সময় বেশ কিছু সংযোজন-বিয়োজনসহ সংশোধন করা হয়। আর ২০১৪ সালে আর একদফা ঘষামাজা করে পেপারব্যাক সংস্করণ প্রকাশ করা হয় বইটির।
পিলগ্রিমস অ্যান্ড সুলতানস: দ্য হজ আন্ডার দ্য অটোমানস; সুরাইয়া ফারুকী; ব্লুমসবারি পাবলিশিং, লন্ডন, ২০১৪।



