বিয়ের খুতবা: ইসলামী দাম্পত্য জীবনের বরকতময় সূচনা
বিয়ে ইসলামে একটি পবিত্র সামাজিক বন্ধন ও গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হিসেবে স্বীকৃত। এই পবিত্র বন্ধনের সূচনায় বিয়ের খুতবা পাঠ করা নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর একটি উল্লেখযোগ্য সুন্নত। বর ও কনের ইজাব-কবুলের ঠিক পূর্বে আল্লাহর প্রশংসা ও কুরআনের আয়াত সংবলিত এই খুতবা পাঠের মাধ্যমে নতুন জীবনের বরকতময় সূচনা হয়।
খুতবা পাঠের ধর্মীয় গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা
অনেক মুসলিম ভাই-বোন অজ্ঞতার কারণে বিয়ের অনুষ্ঠানে এই গুরুত্বপূর্ণ খুতবা পাঠ থেকে বঞ্চিত হন। ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে খুতবা পড়া ওয়াজিব বা বাধ্যতামূলক নয়, তবে এটি একটি সুন্নত আমল। দুজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে ইজাব ও কবুল সঠিকভাবে সম্পন্ন হলে বিয়ে শুদ্ধ হয়ে যায়। কিন্তু সুন্নতের সওয়াব ও দাম্পত্য জীবনে বরকত লাভের জন্য খুতবা পাঠ করা অত্যন্ত জরুরি।
বিয়ের সংক্ষিপ্ত খুতবার আরবি পাঠ
নিচে বিয়ের জন্য একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু পূর্ণাঙ্গ আরবি খুতবা উপস্থাপন করা হলো:
إِنَّ الْحَمْدَ لِلَّهِ نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِينُهُ وَنَسْتَغْفِرُهُ وَنُؤْمِنُ بِهِ وَنَتَوَكَّلُ عَلَيْهِ، وَنَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ شُرُورِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا، مَنْ يَهْدِهِ اللَّهُ فَلَا مُضِلَّ لَهُ، وَمَنْ يُضْلِلْ فَلَا هَادِيَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ سَيِّدَنَا وَمَوْلَانَا مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ، الَّذِي أُرْسِلَ إِلَى النَّاسِ كَافَّةً بَشِيرًا وَنَذِيرًا، وَدَاعِيًا إِلَى اللَّهِ بِإِذْنِهِ سِرَاجًا وَقَمَرًا مُنِيرًا، أَمَّا بَعْدُ فَأَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ، بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِيَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ وَقَالَ تَعَالَى: يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ، وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا، وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً، وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ، إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا وَقَالَ تَعَالَى: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوا قَوْلًا سَدِيدًا، يُصْلِحْ لَكُمْ أَعْمَالَكُمْ، وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ، وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًاوَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: إِذَا تَزَوَّجَ الْعَبْدُ فَقَدِ اسْتَكْمَلَ نِصْفَ الدِّينِ، فَلْيَتَّقِ اللَّهَ فِي النِّصْفِ الْبَاقِي وَقَالَ ﷺ: النِّكَاحُ مِنْ سُنَّتِي، فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي وَقَالَ: تَزَوَّجُوا الْوَدُودَ الْوَلُودَ، فَإِنِّي مُكَاثِرٌ بِكُمُ الْأَنْبِيَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
বাংলা উচ্চারণ ও অর্থসহ বিস্তারিত ব্যাখ্যা
বাংলা উচ্চারণ: ইন্নাল হামদা লিল্লাহি নাহমাদুহু ওয়া নাস্তা'ঈনুহু ওয়া নাস্তাগফিরুহু ওয়া নু'মিনু বিহি ওয়া নাতাওয়াক্কালু আলাইহি। ওয়া না'ঊজুবিল্লাহি মিন শুরূরি আনফুসিনা ওয়া মিন সাইয়িআতি আ'মালিনা। মাই ইয়াহ্দিহিল্লাহু ফালা মুদিল্লালাহু, ওয়া মাই ইউদলিল ফালা হাদিয়ালাহু। ওয়া আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, ওয়া আশহাদু আন্না সাইয়িদানা ওয়া মাওলানা মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু; আল্লাজি উরসিলা ইলান নাসি কাফফাতান বাশীরাঁও ওয়া নাযীরাঁও, ওয়া দা ইয়ান ইলাল্লাহি বি-ইজনিহি সিরাজাঁও ওয়া কামারাম মুনিরা। আম্মা বা'দ— ফাআ'ঊজুবিল্লাহি মিনাশ শাইত্বানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম। ইয়া আইয়ুহাল্লাজিনা আমানুত্তাকুল্লাহা হাক্কা তুক্বাতিহি ওয়া লা তামূতুন্না ইল্লা ওয়া আনতুম মুসলিমূন।
বাংলা অর্থ: নিশ্চয়ই সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আমরা তাঁর প্রশংসা করি, তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি এবং ক্ষমা চাই। আমরা তাঁর উপর ঈমান রাখি ও তাঁর উপর ভরসা করি। আমরা আমাদের নফসের অকল্যাণ থেকে ও আমাদের মন্দ কাজগুলো থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করি। আল্লাহ যাকে হিদায়াত দেন, তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারে না এবং আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তাকে কেউ হিদায়াত দিতে পারে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই এবং আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমাদের নেতা ও অভিভাবক মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর বান্দা ও রাসূল। যিনি সমগ্র মানুষের জন্য সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন এবং আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁর দিকে আহ্বানকারী হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন—একটি উজ্জ্বল প্রদীপ ও আলোকিত চন্দ্রস্বরূপ।
কুরআনের আয়াত ও হাদিসের উদ্ধৃতি
খুতবায় কুরআনের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত ও হাদিস অন্তর্ভুক্ত রয়েছে:
- সুরা আলে ইমরানের ১০২ নং আয়াত: "হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় করো এবং মুসলিম অবস্থায়ই মৃত্যুবরণ করো।"
- সুরা নিসার ১ নং আয়াত: "হে মানুষ, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকে তার জোড়া সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের দুজন থেকে বহু নর-নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন।"
- সুরা আহজাবের ৭০-৭১ নং আয়াত: "হে মুমিনগণ, আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো। তিনি তোমাদের কাজগুলো সংশোধন করবেন এবং তোমাদের পাপগুলো ক্ষমা করবেন।"
নবীজির হাদিস থেকে গুরুত্বপূর্ণ বাণী
- রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন: "বান্দা যখন বিয়ে করে, তখন সে তার অর্ধেক দ্বীন পূর্ণ করে নেয়। সুতরাং অবশিষ্ট অর্ধেকের ব্যাপারে সে যেন আল্লাহকে ভয় করে।"
- তিনি আরও বলেছেন: "বিয়ে আমার সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত। যে ব্যক্তি আমার সুন্নত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, সে আমার দলভুক্ত নয়।"
- আরও বলেছেন: "তোমরা স্নেহশীলা ও অধিক সন্তানপ্রসূ নারীকে বিয়ে করো। কারণ কিয়ামতের দিন আমি তোমাদের সংখ্যা নিয়ে নবীদের সাথে গর্ব করব।"
খুতবা পাঠের কার্যকর পদ্ধতি ও বিধান
বিয়ের খুতবা দাঁড়িয়ে পড়া সুন্নত, তবে শারীরিক অক্ষমতা বা অন্য কোনো কারণে বসে পড়লেও বিয়ের কোনো ক্ষতি হয় না। খুতবার মূল অংশ আরবিতে পাঠ করা সুন্নত, তবে উপস্থিত বর-কনে ও মেহমানদের জন্য মাতৃভাষায় নসিহত বা উপদেশ দেওয়া উত্তম। বিয়ে একটি পবিত্র সামাজিক ও ধর্মীয় চুক্তি, আর এই চুক্তিকে নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর শেখানো পদ্ধতিতে খুতবার মাধ্যমে শুরু করলে দাম্পত্য জীবন বরকতময় হয়ে ওঠে।
প্রতিটি মুসলিম দম্পতির উচিত তাদের বিয়ের অনুষ্ঠানে এই গুরুত্বপূর্ণ সুন্নতটি যথাযথভাবে পালন করা। এতে যেমন ধর্মীয় সওয়াব অর্জিত হয়, তেমনি নতুন দাম্পত্য জীবনের সূচনাও হয় বরকত ও কল্যাণের মধ্য দিয়ে। ইসলামী বিধান মোতাবেক বিয়ে সম্পন্ন করতে এবং দাম্পত্য জীবনে সফলতা অর্জনে এই খুতবা পাঠের ভূমিকা অপরিসীম।



