ময়মনসিংহের ঐতিহাসিক শশীলজ পরিদর্শন করলেন বন্ধুসভার সদস্যরা
ময়মনসিংহের শশীলজ পরিদর্শনে বন্ধুসভার সদস্যরা

ময়মনসিংহের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন শশীলজে বন্ধুসভার সদস্যদের পরিদর্শন

হাওর, জঙ্গল আর মহিষের শিং—এই তিনে ময়মনসিংহের পরিচয়। প্রবাদে বর্ণিত এই জেলাটি ১৩টি উপজেলা নিয়ে বিস্তৃত এবং এখানে রয়েছে অসংখ্য প্রত্নতাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদ। ১০ এপ্রিল বিকেলে, অতীত গৌরবের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নয়নাভিরাম শশীলজ পরিদর্শন করেছেন ময়মনসিংহ বন্ধুসভার সদস্যরা। ব্রহ্মপুত্র নদের তীরঘেঁষা এই স্থাপনাটি জমিদারি আমলের এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে আজও টিকে আছে।

শশীলজের ইতিহাস ও স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য

জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলেও তাদের স্মৃতিবিজড়িত অনেক স্থাপনা এখনো রয়ে গেছে, যার মধ্যে শশীলজ অন্যতম। মুক্তাগাছার জমিদার সূর্যকান্ত মহারাজের এই কীর্তিটি একজন নারীকে ঘিরে স্থাপিত হয়েছিল। দীর্ঘদিন এটি মহিলা টিচার্স ট্রিনিং কলেজ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার পর এখন প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

মুক্তাগাছার জমিদার শ্রীকৃষ্ণ আচার্যর তৃতীয় উত্তরসূরি রঘুনন্দন আচার্য নিঃসন্তান ছিলেন, তাই তিনি গৌরীকান্ত আচার্য চৌধুরীকে দত্তক পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। মৃত্যুর আগে তিনি জমিদারির দায়িত্ব দত্তক পুত্রের হাতে অর্পণ করেন। পুরো বাড়িটি ৯ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত, যার মূল ফটকে ১৬টি গম্বুজ শোভা পাচ্ছে। ভবনের ভেতরে প্রায় প্রতিটি ঘরেই ছাদ থেকে ঝুলন্ত একই রকমের ঝাড়বাতি দেখা যায়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

স্থাপনার অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্য

সাধারণ বাসভবন ছাড়াও শশীলজে রয়েছে নাচঘর এবং স্নানঘর। স্নানঘরে একটি সুড়ঙ্গপথ আছে, যা ধারণা করা হয় মুক্তাগাছায় আসা-যাওয়ার জন্য ব্যবহৃত হতো। মূল ভবনের পেছনভাগে একটি দোতলা স্নানঘর অবস্থিত, যেখানে বসে রানি পাশের পুকুরে হাঁসের খেলা দেখতেন। এই পুকুরের ঘাট মার্বেল পাথরে বাঁধানো, যা এর সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শশীলজের মূল ভবনের সামনে একটি বাগান রয়েছে, যার মাঝখানে শ্বেতপাথরের ফোয়ারা এবং গ্রিক দেবী ভেনাসের মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। বাগানের পেছনে লালচে ইট ও হলুদ দেয়ালে নির্মিত শশীলজ এবং পাশেই পদ্মবাগান অবস্থিত। ভবনের ভেতরে বারান্দা অতিক্রম করে কয়েক ধাপ সিঁড়ি পেরোলেই রঙ্গালয়, বিশ্রামঘর এবং কাঠের মেঝে যুক্ত হলঘর দেখা যায়। হলঘরের পাশে বর্ণিল মার্বেল পাথরে নির্মিত আরেকটি জলফোয়ারা রয়েছে, যার ঠিক ওপরের ছাদ থেকে স্ফটিক স্বচ্ছ কাচের ঝাড়বাতি ঝোলানো।

বন্ধুসভার সদস্যদের মতামত ও সংরক্ষণের আহ্বান

পরিদর্শনকালে ময়মনসিংহ বন্ধুসভার সহসভাপতি রাবিয়াতুল বুশরা বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বিলুপ্তপ্রায়। যে অল্প সংখ্যক নিদর্শন বিদ্যমান, তা আমাদের সংরক্ষণ করা উচিত। পরবর্তী প্রজন্মের জানার জন্য হলেও এ ধরনের স্থাপনাগুলোর প্রতি গুরুত্ব দেওয়া এবং সংরক্ষণ করা জরুরি।’

সাধারণ সম্পাদক উম্মে সালমা যোগ করেন, ‘পৌরাণিক রাজা ও রাজ্যের কাহিনি কেবল বই পড়ে জানার চেয়ে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সরেজমিনে পরিদর্শন করা অনেক বেশি কার্যকর। এতে জ্ঞান বাড়ার পাশাপাশি আমাদের ঐতিহ্য রক্ষণাবেক্ষণও সম্ভব হয়।’

এই পরিদর্শন কার্যক্রমে আরও উপস্থিত ছিলেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বোরহান উদ্দিন, প্রশিক্ষণ সম্পাদক মুনমুন আহমেদ, ম্যাগাজিন সম্পাদক ফারহান তানভীর, কার্যনির্বাহী সদস্য সরকার সাদমান ওয়াসিত এবং নুসরাত আহমদসহ অন্যান্য বন্ধুসভার সদস্যরা। ময়মনসিংহ বন্ধুসভার সভাপতি এই কার্যক্রমের আয়োজন ও সমন্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

শশীলজের অতিরিক্ত আকর্ষণ

ভবনটির পেছনে একটি ছোট উঠান রয়েছে, যা সবুজ ঘাসে আবৃত। এই উঠান পেরোলেই একটি অপরিসর জলাশয় দেখা যায়, যার পূর্ব ও পশ্চিম পাড়ে দুটি জরাজীর্ণ ঘাট আছে। তবে দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত দ্বিতল স্নানঘাটটির সৌন্দর্য সত্যিকার অর্থেই অসাধারণ, যা দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। শশীলজ শুধু একটি স্থাপনা নয়, বরং ময়মনসিংহের ইতিহাস ও সংস্কৃতির জীবন্ত সাক্ষী হিসেবে টিকে আছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।