চা-শিঙাড়ার স্মৃতি: ডাস্টবিন থেকে আমেরিকা
চা-শিঙাড়ার স্মৃতি: ডাস্টবিন থেকে আমেরিকা

চায়ের সঙ্গে শিঙাড়ার এই সখ্য কবে থেকে শুরু, তা জানা নেই। আমার নিজের সঙ্গেও এই চা-শিঙাড়ার পরিচিতির দিনক্ষণ মনে নেই, সম্ভবত থাকার কথাও নয়। শুধু বিচ্ছিন্নভাবে মনে পড়ে চা-শিঙাড়ার সঙ্গে কাটানো সেই দিনগুলো। ডুবো তেলে ভাজা বাদামি শিঙাড়ার ভেতরে আলুর সঙ্গে কত স্মৃতি যে লুকিয়ে ছিল, তা একা একা চা-শিঙাড়া খেতে খেতে সেদিন উপলব্ধি করলাম। প্রতিটি কামড়ের সঙ্গে ধোঁয়া আর সেই সময়গুলো চোখের সামনে ভেসে উঠছিল।

শৈশবের শিঙাড়া

একসময় নিয়মিত খিলগাঁওয়ে ডাস্টবিনের বিপরীতে রাস্তার কোণে থাকা রেস্তোরাঁয় দুই টাকার ছোট শিঙাড়া খাওয়া হতো। দাভাই টিউশনি শেষে ফেরার পথে নিয়ে আসতেন, কখনো বাবা আনতেন, আবার শুক্রবারে আত্মীয়দের হাতেও আসত সেই শিঙাড়া। ডাস্টবিনের পাশে থাকায় এর নাম হয়েছিল ‘ডাস্টবিনের দোকানের শিঙাড়া’। মা রাগ করতেন দুপুরে ওসব খেয়ে ভাত না খাওয়ার জন্য; বিকেলে দুধ-চায়ের সঙ্গে খেতে বলতেন। লোভী জিহ্বা থেকে বাঁচত মাত্র দু-একটা, আর সেগুলো খাওয়া হতো চায়ের সঙ্গে। বাঙালি হয়ে চা-শিঙাড়ার এই জমজমাট উপাখ্যান ব্যাখ্যা করার দরকার নেই।

গ্রামে শিঙাড়া

গ্রামের বাড়িতেও শিঙাড়া খাওয়া হতো। কাছের বাজার হোক বা দূরের উপজেলার দোকান—শিঙাড়া ছিল সঙ্গী। উপজেলায় ভাইদের সঙ্গে গেলে দোকানে বসে শিঙাড়া খাওয়া ছিল প্রায় নিয়ম। কয়েক মাইল হেঁটে গরম গরম শিঙাড়া-চা, আর মাঝে মাঝে রসগোল্লা—এর স্বাদ ছিল অনন্য। জেঠু আমাদের দেখামাত্র শিঙাড়া আনানোর আদেশ দিতেন। তিনি চলে যাওয়ার পরে ওই রাস্তার দিকে তাকিয়ে আমরা দীর্ঘশ্বাস ফেলতাম। কত মানুষ চলে যায়, কিন্তু যাত্রাপথের এক সাধারণ মোড়ে স্মৃতি রেখে যায়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বুয়েটে শিঙাড়া

বুয়েটে পড়তে এসেও শিঙাড়ার প্রতি ভালোবাসা কমেনি। প্রতিদিন বিকেলে হলের ক্যানটিনে ‘হালকা’ খাবারের নামে যা খেতাম, তা ক্যালরি বা ওজনে হালকা ছিল না। খাবারের মান ভালো না হলেও উপায় ছিল না। আলুর চপ, ছোলা, চিকেন চপের সঙ্গে তালিকায় থাকত শিঙাড়া আর দুধ-চা। কলেজের কথাই না বলি—ব্রেক শুরু হওয়ার এক মিনিটের মধ্যে দৌড়ে ক্যানটিনে পৌঁছালেও শিঙাড়ার দেখা মিলত না। আমার ধারণা ছিল, শিঙাড়ার লোভে কিছু ছাত্র ব্রেকের আগের ক্লাস করত না। তবু ধাক্কাধাক্কির মধ্যে মাঝে মাঝে শিঙাড়া জুটত। পরিশ্রমের পরে পাওয়া শিঙাড়ার স্বাদ ছিল অসাধারণ!

স্কুলের টিফিনে শিঙাড়া

সরকারি স্কুলে পড়ার সময় টিফিনে সপ্তাহে এক দিন বা দুই সপ্তাহে এক দিন শিঙাড়া আসত। সেটা দেখে আমাদের কী খুশি হতো!

বরিশালের বোম্বাই মরিচ

বরিশাল অঞ্চলে শিঙাড়ায় বোম্বাই মরিচ দেওয়ার প্রচলন দেখেছি। ঢাকায় বেশির ভাগ জায়গায় তা দিতে দেখিনি। সেই বোম্বাইয়ের ঝাল কমবেশি যাই হোক, ঘ্রাণ ছিল অসামান্য। সেই স্বাদ-ঘ্রাণের টানে একের পর এক শিঙাড়া মুখে চলে যেত। অ্যাসিডিটির সমস্যা হবে পরে দেখা যাবে! অ্যাসিডিটি বাড়াতে দুধ-চায়ের চেয়ে ভালো আর কী! বাড়ি ফেরার দিন বরিশাল শহরে আত্মীয়দের বাসায় বা বিখ্যাত সকাল-সন্ধ্যা রেস্তোরাঁয় শিঙাড়া ছিল পছন্দের প্রথম দিকের খাবার। একবার সোনা মামার বাসার কথা মনে পড়ে। সকালে ভরপেট পরোটা-ভাজি খেয়েও খানিক পরে শিঙাড়া এলে ভরা পেট বুক পর্যন্ত ভরাতে খেয়ে নিয়েছিলাম দুটো বড় শিঙাড়া। নোয়া মামা এসেছিল সেদিন, সেটাও মনে আছে। নোয়া মামা নেই প্রায় ১১ বছর। কত স্মৃতি, কত কথা মনে নেই, কিন্তু হাজার হাজার শিঙাড়ার মাঝে এই স্মৃতি আজও টিকে আছে।

প্রবাসে শিঙাড়া

দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে এসে টাটকা শিঙাড়ার মতো খাবার পাওয়া কঠিন। মাসির বাসায় ঘরে বানানো শিঙাড়া খাওয়া হলেও নিয়মিত নয়। তবে গত বছর থেকে মূল ক্যাম্পাসের কাছে একটি ভারতীয় রেস্তোরাঁ আবির্ভাব হওয়ায় সেই দুঃখ লাঘব হয়েছে। নিয়মিত খদ্দের হয়ে উঠতে দেরি হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রে আমার প্রিয় শিঙাড়ার (ওদের ভাষায় সমুচা) তালিকায় এটি এখন পর্যন্ত এক নম্বরে। চা-শিঙাড়ার এই প্যাকেজ আমি একা বা সবার সঙ্গে মিলে অসংখ্যবার খেয়েছি।

প্রতি কামড় যেন কয়েক বছর পিছিয়ে নিয়ে যায়। স্বাদ বদলায়, দাম বদলায়, স্থান বদলায়, কিন্তু সবকিছু কীভাবে যেন সঙ্গের সময়টাকে আটক রাখে। মাত্র দুই টাকার (এখন ডলারের) শিঙাড়া আর দুধ-চা এত স্মৃতি ধরে রাখতে পারে, কে জানত!

লেখক: অংকন ঘোষ দস্তিদার, শিক্ষার্থী, ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় আরবানা-শ্যাম্পেইন