জুলুমের পরিণতি: মজলুমের আহাজারি ও জালিমের ধ্বংসের গল্প
জুলুমের পরিণতি: মজলুমের আহাজারি ও জালিমের ধ্বংস

পৃথিবীর ইতিহাসে যত অশান্তি, রক্তপাত ও মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে, তার বড় একটি কারণ হলো জুলুম। যখন মানুষ ক্ষমতার অহংকারে অন্যের অধিকার কেড়ে নেয়, দুর্বলকে নির্যাতন করে কিংবা মিথ্যা অপবাদে মানুষের সম্মান নষ্ট করে—তখন শুধু একটি ব্যক্তি নয়, পুরো সমাজই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইসলাম মানুষের জান, মাল, ইজ্জত ও অধিকারকে অত্যন্ত মর্যাদা দিয়েছে। তাই জুলুমকে শুধু সামাজিক অপরাধ নয়; বরং ভয়াবহ কবিরা গুনাহ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। জালিম হয়তো কিছু সময় দুনিয়াতে শক্তিশালী থাকে, কিন্তু আল্লাহর আদালতে তার কোনো পালানোর পথ নেই। অন্যদিকে মজলুমের দীর্ঘশ্বাস কখনো বিফলে যায় না; কারণ তার আর্তনাদ সরাসরি আরশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

জুলুম কী এবং কেন তা এত ভয়াবহ?

ইসলামে জুলুম বা অত্যাচারকে অন্যতম কবিরা গুনাহ হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। কারও অধিকার হরণ, বিনা অপরাধে নির্যাতন বা মানহানি করা জুলুমের অন্তর্ভুক্ত। জালিমকে মহান আল্লাহ সাময়িক অবকাশ দিলেও তার শাস্তি নিশ্চিত। বিশেষ করে দুনিয়া ও আখিরাত—উভয় জায়গাতেই জুলুমের কঠিন বিচার হয়ে থাকে।

জুলুমের পরিধি কতটুকু?

ইসলাম সব ধরনের অত্যাচারকে হারাম ঘোষণা করেছে। শুধু মুসলিম নয়, কোনো অমুসলিমের ওপর জুলুম করাও ইসলামে নিষিদ্ধ। সাধারণত নিচের কাজগুলো জুলুমের পর্যায়ভুক্ত—

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

১. কারও প্রাপ্য অধিকার হরণ করা

ইসলামে অন্যের হক নষ্ট করাকে ভয়াবহ জুলুম হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। মানুষের সম্পদ, জমি, উত্তরাধিকার, শ্রমের মূল্য কিংবা সামাজিক অধিকার অন্যায়ভাবে কেড়ে নেওয়া আল্লাহর কাছে অত্যন্ত ঘৃণিত কাজ। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—

وَلَا تَبْخَسُوا النَّاسَ أَشْيَاءَهُمْ

‘তোমরা মানুষের প্রাপ্য জিনিস কম দিও না বা হরণ কর না।’ (সুরা হুদ: আয়াত ৮৫)

রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন—

مَنْ ظَلَمَ قِيدَ شِبْرٍ مِنَ الْأَرْضِ طُوِّقَهُ مِنْ سَبْعِ أَرَضِينَ

‘যে ব্যক্তি এক বিঘত জমিও অন্যায়ভাবে দখল করবে, কিয়ামতের দিন তার গলায় সাত জমিন পেঁচিয়ে দেওয়া হবে।’ (বুখারি ২৪৫৩)

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অর্থাৎ মানুষের অধিকার নষ্ট করা শুধু সামাজিক অপরাধ নয়; বরং আখিরাতের ভয়াবহ জবাবদিহির কারণ।

২. দুর্বলের ওপর ক্ষমতার দাপট দেখানো বা নৃশংসতা চালানো

ক্ষমতা, অর্থ বা প্রভাব খাটিয়ে দুর্বল মানুষকে ভয় দেখানো, শোষণ করা কিংবা নির্যাতন করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। ইসলাম সবসময় দুর্বল, অসহায় ও নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়াতে শিক্ষা দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন—

إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الظَّالِمِينَ

‘নিশ্চয়ই আল্লাহ জালিমদের ভালোবাসেন না।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ৫৭)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

اتَّقُوا دَعْوَةَ الْمَظْلُومِ فَإِنَّهُ لَيْسَ بَيْنَهَا وَبَيْنَ اللَّهِ حِجَابٌ

‘মজলুমের বদদোয়া থেকে বেঁচে থাকো। কারণ তার দোয়া ও আল্লাহর মাঝে কোনো পর্দা নেই।’ (বুখারি ২৪৪৮)

অত্যাচারী ব্যক্তি হয়তো দুনিয়াতে কিছু সময় শক্তিশালী থাকে, কিন্তু মজলুমের কান্না কখনো বিফলে যায় না।

৩. বিনা অপরাধে কাউকে নির্যাতন বা উৎপীড়ন করা

কাউকে অন্যায়ভাবে কষ্ট দেওয়া, মারধর করা, জেলে রাখা, অপমান করা বা মানসিক নির্যাতন করা ইসলামে বড় গুনাহ। ইসলাম মানুষের জান, মাল ও সম্মানকে অত্যন্ত মর্যাদা দিয়েছে। বিদায় হজের ভাষণে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

إِنَّ دِمَاءَكُمْ وَأَمْوَالَكُمْ وَأَعْرَاضَكُمْ عَلَيْكُمْ حَرَامٌ

‘তোমাদের রক্ত, সম্পদ ও সম্মান একে অপরের জন্য হারাম (অর্থাৎ অবৈধভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা নিষিদ্ধ)।’ (মুসলিম ১২১৮)

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন—

وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُبِينًا

‘যারা বিনা অপরাধে মুমিন পুরুষ ও নারীদের কষ্ট দেয়, তারা অপবাদ ও স্পষ্ট গুনাহ বহন করে।’ (সুরা আহযাব: আয়াত ৫৮)

৪. মানহানিকর অপবাদ দেওয়া

মিথ্যা অপবাদ, গীবত, চরিত্রহনন বা কারো সম্মান নষ্ট করা ইসলামে মারাত্মক অপরাধ। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপবাদ ও কুৎসা ছড়ানো ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, যা একজন মানুষের জীবন ধ্বংস করে দিতে পারে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَب بَّعْضُكُم بَعْضًا

‘হে মুমিনগণ! তোমরা অধিক ধারণা থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয় কিছু ধারণা গুনাহ। তোমরা একে অপরের গোপনীয়তা অনুসন্ধান কর না এবং কেউ কারো গীবত কর না।’ (সুরা হুজুরাত: আয়াত ১২)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ

‘প্রকৃত মুসলিম সে, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে।’ (বুখারি ১০)

অতএব, কারো সম্মান নষ্ট করা কিংবা মিথ্যা অপবাদ ছড়ানো শুধু নৈতিক অপরাধ নয়; বরং তা আল্লাহর কাছে কঠিন জবাবদিহির কারণ।

পবিত্র কুরআনের সতর্কবার্তা

জালিমরা অনেক সময় মনে করে তাদের এই অপরাধ দেখার কেউ নেই। কিন্তু আল্লাহ তাআলা জালিমদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে পূর্ণ অবগত। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—

وَلَا تَحْسَبَنَّ اللَّهَ غَافِلًا عَمَّا يَعْمَلُ الظَّالِمُونَ ۚ إِنَّمَا يُؤَخِّرُهُمْ لِيَوْمٍ تَشْخَصُ فِيهِ الْأَبْصَارُ

‘তোমরা জালিমদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আল্লাহকে উদাসীন মনে কর না। তিনি তো তাদেরকে শুধু সেই দিন পর্যন্ত অবকাশ দেন, যেদিন চোখগুলো আতঙ্কে স্থির হয়ে যাবে।’ (সুরা ইবরাহিম: আয়াত ৪২)

মজলুমের দোয়া কখনো বিফলে যায় না

অত্যাচারিত বা মজলুম ব্যক্তির দোয়া মহান আল্লাহর কাছে সরাসরি কবুল হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—‘মজলুমের দোয়া মেঘমালার ওপরে উঠিয়ে নেওয়া হয় এবং তার জন্য আসমানের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়।’ এরপর আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَعِزَّتِي لَأَنْصُرَنَّكِ وَلَوْ بَعْدَ حِينٍ

‘আমার সম্মানের শপথ! কিছুটা বিলম্ব হলেও আমি অবশ্যই তোমাকে সাহায্য করব।’ (তিরমিজি ৩৫৯৮)

জুলুমের শাস্তি দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জায়গাতেই

জুলুম এমন এক অপরাধ, যা আল্লাহ তখন পর্যন্ত ক্ষমা করেন না, যতক্ষণ না অত্যাচারিত ব্যক্তি ক্ষমা করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

ذَنْبَانِ يُعَجِّلُهُمَا اللَّهُ فِي الدُّنْيَا: الْبَغْيُ وَقَطِيعَةُ الرَّحِمِ

‘দুটি পাপের শাস্তি আল্লাহ আখিরাতের আগে দুনিয়াতেও দিয়ে থাকেন—জুলুম বা সীমালঙ্ঘন এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা।’ (তিরমিজি ২৫১১)

ক্ষমতার মোহে যারা দুর্বলদের ওপর জুলুম করে, তারা আসলে নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনে। সামাজিক শান্তি ও সম্প্রীতি রক্ষায় জুলুম বর্জন করা প্রতিটি মুমিনের দায়িত্ব।

এসব ক্ষেত্রে আমাদের করণীয় কী?

  • কারো হক নষ্ট না করা
  • ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে বেঁচে থাকা
  • অন্যায়ের প্রতিবাদ করা
  • মজলুমের পাশে দাঁড়ানো

আল্লাহর সাহায্য চেয়ে দোয়া: حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ উচ্চারণ: ‘হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি‘মাল ওয়াকিল।’ অর্থ: ‘আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট, আর তিনিই উত্তম কর্মবিধায়ক।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৭৩)

জুলুম কখনো স্থায়ী শক্তির নাম নয়; বরং তা ধ্বংসের সূচনা। ইতিহাস সাক্ষী—অত্যাচারী যত শক্তিশালীই হোক না কেন, একদিন তাকে পতনের স্বাদ গ্রহণ করতেই হয়েছে। আর মজলুমের চোখের পানি কখনো বৃথা যায় না; আল্লাহ তাআলা সময়মতো তার বিচার অবশ্যই করেন। তাই আমাদের উচিত কারো হক নষ্ট না করা, কাউকে কষ্ট না দেওয়া এবং ক্ষমতা বা প্রভাবকে অন্যায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করা। মানুষের অভিশাপ নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা একজন মুমিনের প্রকৃত পরিচয়। আসুন, আমরা নিজেদের অন্তরকে অহংকার, হিংসা ও জুলুম থেকে পবিত্র রাখি। মজলুমের পাশে দাঁড়াই, অন্যায়ের প্রতিবাদ করি এবং সর্বদা আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে জুলুম থেকে হেফাজত করুন, ন্যায় ও ইনসাফের পথে অটল রাখুন এবং তার সন্তুষ্টিকে জীবনের সবচেয়ে বড় সফলতা বানানোর তৌফিক দান করুন। আমিন।