জোহরের নামাজের সময় শেষ হয় কখন? কুরআন-হাদিসের আলোকে বিস্তারিত
জোহরের নামাজের সময় শেষ হয় কখন? কুরআন-হাদিসে বিস্তারিত

জোহরের নামাজ ইসলামের দ্বিতীয় স্তম্ভ এবং মুমিনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। মহান আল্লাহ প্রতিটি নামাজের জন্য নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তাই নামাজের শুদ্ধতা ও কবুলিয়তের শর্ত হলো তা নির্ধারিত ওয়াক্তের মধ্যে আদায় করা। অনেক মুসল্লির মনে প্রশ্ন জাগে—জোহরের নামাজের সময় কখন শুরু হয় এবং কখন শেষ হয়? এ বিষয়ে কুরআন, হাদিস ও ফিকহের গ্রন্থগুলোতে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে।

নির্ধারিত সময়ে নামাজ আদায়ের গুরুত্ব

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—إِنَّ الصَّلَاةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كِتَابًا مَوْقُوتًا ‘নিশ্চয়ই নামাজ মুমিনদের ওপর নির্ধারিত সময়ে ফরজ করা হয়েছে।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ১০৩) এই আয়াত থেকে স্পষ্ট হয় যে, প্রতিটি নামাজের নির্দিষ্ট সময় রয়েছে এবং সেই সময়ের মধ্যেই তা আদায় করা আবশ্যক।

জোহরের ওয়াক্ত কখন শুরু হয়?

জোহরের নামাজের সময় শুরু হয় সূর্য যখন মধ্যাকাশ অতিক্রম করে পশ্চিম দিকে হেলে পড়ে, অর্থাৎ ‘জাওয়াল’-এর পর। আল্লাহ তাআলা বলেন—أَقِمِ الصَّلَاةَ لِدُلُوكِ الشَّمْسِ إِلَىٰ غَسَقِ اللَّيْلِ ‘সূর্য ঢলে পড়া থেকে রাতের অন্ধকার পর্যন্ত নামাজ কায়েম করো।’ (সুরা আল-ইসরা: আয়াত ৭৮) মুফাসসিরগণ ব্যাখ্যা করেছেন, ‘দুলুকুশ শামস’ বলতে সূর্যের পশ্চিম দিকে হেলে পড়াকে বোঝানো হয়েছে, যা জোহরের সময়ের সূচনাকে নির্দেশ করে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

হাদিসে জোহরের সময়সীমা

রাসুলুল্লাহ (সা.) জোহরের সময় সম্পর্কে বলেছেন—وَقْتُ الظُّهْرِ إِذَا زَالَتِ الشَّمْسُ وَكَانَ ظِلُّ الرَّجُلِ كَطُولِهِ مَا لَمْ يَحْضُرِ الْعَصْرُ ‘সূর্য ঢলে পড়ার পর জোহরের সময় শুরু হয় এবং মানুষের ছায়া তার উচ্চতার সমান না হওয়া পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে, যতক্ষণ না আসরের সময় উপস্থিত হয়।’ (মুসলিম ৬১৩) অন্য এক বর্ণনায় এসেছে—وَوَقْتُ الظُّهْرِ مَا لَمْ يَحْضُرِ الْعَصْرُ ‘জোহরের সময় হলো, যতক্ষণ না আসরের সময় উপস্থিত হয়।’ (মুসলিম ৬১২)

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জোহরের সময় শেষ হওয়ার বিষয়ে মাজহাবভিত্তিক মতামত

হানাফি মাজহাবের মত

হানাফি ফকিহদের মতে, কোনো বস্তুর মূল ছায়া (ফাই-জাওয়াল) বাদ দিয়ে তার ছায়া যখন বস্তুর উচ্চতার দ্বিগুণ হয়, তখন জোহরের সময় শেষ হয় এবং আসরের ওয়াক্ত শুরু হয়। (আল-হিদায়া, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৬৭)

শাফেয়ি, মালিকি ও হাম্বলি মাজহাবের মত

জমহুর (অধিকাংশ) আলেমের মতে, কোনো বস্তুর মূল ছায়া বাদ দিয়ে ছায়া যখন তার সমান হয়, তখন জোহরের সময় শেষ হয়ে যায় এবং আসরের সময় শুরু হয়। (আল-মাজমু ৩/২৭, আল-মুগনি ১/২৩২)

গ্রীষ্মকালে জোহরের নামাজ কিছুটা বিলম্বে আদায়ের নির্দেশ

রাসুলুল্লাহ (সা.) সাধারণত নামাজ ওয়াক্তের শুরুতেই আদায় করতেন। তবে প্রচণ্ড গরমের সময় জোহরের নামাজ কিছুটা বিলম্বে পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন—إِذَا اشْتَدَّ الْحَرُّ فَأَبْرِدُوا بِالصَّلَاةِ فَإِنَّ شِدَّةَ الْحَرِّ مِنْ فَيْحِ جَهَنَّمَ ‘যখন প্রচণ্ড গরম হয়, তখন জোহরের নামাজ কিছুটা ঠান্ডা হওয়ার পর আদায় কর। কারণ তীব্র গরম জাহান্নামের উত্তাপের অংশবিশেষ।’ (বুখারি ৫৩৬, মুসলিম ৬১৬) এ কারণে সাহাবায়ে কেরাম গরমকালে জোহরের নামাজ কিছুটা দেরিতে এবং শীতকালে দ্রুত আদায় করতেন। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত—كَانَ النَّبِيُّ ﷺ إِذَا اشْتَدَّ الْبَرْدُ بَكَّرَ بِالصَّلَاةِ وَإِذَا اشْتَدَّ الْحَرُّ أَبْرَدَ بِالصَّلَاةِ ‘প্রচণ্ড শীত হলে নবী (সা.) নামাজ তাড়াতাড়ি আদায় করতেন এবং প্রচণ্ড গরম হলে কিছুটা বিলম্ব করতেন।’ (নাসাঈ)

মুসল্লিদের করণীয়

  • জোহরের নামাজ ওয়াক্তের শুরুতেই আদায়ের চেষ্টা করা।
  • অযথা দেরি করে আসরের সময়ের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া থেকে বিরত থাকা।
  • স্থানীয় নির্ভরযোগ্য নামাজের সময়সূচি অনুসরণ করা।
  • মসজিদে জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায়ের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া।

জোহরের নামাজের সময় সূর্য পশ্চিম দিকে হেলে পড়ার সঙ্গে শুরু হয় এবং আসরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। তবে এর শেষ সময় নির্ধারণে ফিকহি মাজহাবগুলোর মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে। হানাফি মাজহাব অনুযায়ী ছায়া দ্বিগুণ হলে এবং অন্যান্য তিন মাজহাব অনুযায়ী ছায়া সমান হলে জোহরের সময় শেষ হয়। একজন মুসলমানের জন্য উত্তম হলো ওয়াক্তের শুরুতেই নামাজ আদায় করা এবং আল্লাহর নির্ধারিত সময়সীমার প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। কারণ সময়মতো নামাজ আদায়ই মুমিনের ঈমান, আনুগত্য ও আল্লাহভীতির অন্যতম প্রকাশ।