হজের প্রতিটি মুহূর্ত একজন মুমিনের জীবনের শ্রেষ্ঠ স্মৃতিগুলোর একটি। আর সেই স্মৃতিময় সফরের শেষ অধ্যায় হলো ‘বিদায়ী তাওয়াফ’। কাবাঘরের চারপাশে শেষবারের মতো ঘুরে বিদায় নেওয়ার এই মুহূর্তে হৃদয় ভরে ওঠে ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা ও বিচ্ছেদের বেদনায়।
বিদায়ী তাওয়াফের গুরুত্ব
বিদায়ী তাওয়াফ শুধু একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদত নয়; এটি আল্লাহর ঘরের প্রতি ভালোবাসা, সম্মান এবং পুনরায় ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষার এক অনন্য প্রকাশ। তাই শরিয়ত হজ সম্পন্নকারী বহিরাগত হাজিদের জন্য মক্কা ত্যাগের আগে এ তাওয়াফকে ওয়াজিব করেছে।
কুরআনের নির্দেশনা
আল্লাহ তাআলা বলেন— وَأَتِمُّوا الْحَجَّ وَالْعُمْرَةَ لِلَّهِ ‘তোমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ ও উমরা পূর্ণাঙ্গভাবে সম্পন্ন করো।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৯৬) এই আয়াত আমাদের শিক্ষা দেয় যে হজের প্রতিটি বিধান যথাযথভাবে পালন করা একজন হাজির দায়িত্ব। বিদায়ী তাওয়াফও সেই পূর্ণাঙ্গ হজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশনা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: لَا يَنْفِرَنَّ أَحَدٌ حَتَّى يَكُونَ آخِرُ عَهْدِهِ بِالْبَيْتِ ‘তোমাদের কেউ যেন মক্কা থেকে প্রস্থান না করে, যতক্ষণ না তার সর্বশেষ সম্পর্ক (কর্ম) হয় বাইতুল্লাহর তাওয়াফ।’ (মুসলিম ১৩২৭) এই হাদিস থেকেই বিদায়ী তাওয়াফের ওয়াজিব হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়।
বিদায়ী তাওয়াফ কী?
মক্কার বাইরে থেকে আগত হাজি যখন হজের সকল কার্যক্রম সম্পন্ন করেন এবং নিজ দেশ বা অন্য গন্তব্যে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন মক্কা ত্যাগের আগে কাবা শরিফকে কেন্দ্র করে সাত চক্কর তাওয়াফ করেন। এটিই ‘তাওয়াফে বিদা’ বা বিদায়ী তাওয়াফ।
বিদায়ী তাওয়াফের নিয়ম
- সাধারণ পোশাক পরেই তাওয়াফ করতে হবে।
- হাজরে আসওয়াদ থেকে শুরু করে সাত চক্কর সম্পন্ন করতে হবে।
- এ তাওয়াফে রমল (দ্রুত পদচারণা) নেই।
- ইজতিবা (ডান কাঁধ খোলা রাখা) নেই।
- তাওয়াফ শেষে দুই রাকাত নামাজ আদায় করতে হবে।
- এ তাওয়াফের পর কোনো সাঈ করতে হয় না।
যদি বিদায়ী তাওয়াফ ছুটে যায়
যদি কেউ হজের সব কার্যক্রম শেষ করে বিদায়ী তাওয়াফ না করেই দেশে ফিরে যায়, তাহলে সুযোগ হলে পুনরায় মক্কায় গিয়ে উমরা সম্পন্ন করার পর ছুটে যাওয়া তাওয়াফ আদায় করতে পারে। আর যদি সেখানে গিয়ে তাওয়াফ করা সম্ভব না হয়, তাহলে হারাম এলাকার মধ্যে একটি ছাগল বা দুম্বা দম হিসেবে কুরবানি করার ব্যবস্থা করতে হবে।
বিদায়ী তাওয়াফের আধ্যাত্মিক বার্তা
বিদায়ী তাওয়াফ যেন একজন বান্দার হৃদয়ের ভাষা— ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার ঘর থেকে বিদায় নিচ্ছি, কিন্তু আমার হৃদয় এখানেই রেখে যাচ্ছি। আমাকে আবার আপনার ঘরের মেহমান হওয়ার তাওফিক দান করুন।’ এ তাওয়াফ একজন মুমিনকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে পৃথিবীর সব সফরের শেষ আছে, কিন্তু আল্লাহর দিকে যাত্রা কখনো শেষ হয় না।
বিদায়ী তাওয়াফ হলো হজের সমাপ্তির এক আবেগঘন ইবাদত। এটি শুধু কাবাকে কেন্দ্র করে সাতবার ঘোরার নাম নয়; বরং এটি আল্লাহর ঘরের প্রতি ভালোবাসা, আনুগত্য এবং পুনরায় ফিরে আসার আকুল প্রার্থনার প্রতীক।
যারা হজের সৌভাগ্য অর্জন করেছেন, তারা যেন এ গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব ইবাদত যথাযথভাবে আদায় করেন। আর যারা এখনো হজে যেতে পারেননি, আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের সবাইকে তার পবিত্র ঘরের মেহমান হওয়ার তৌফিক দান করেন।
اللَّهُمَّ لَا تَجْعَلْ هَذَا آخِرَ الْعَهْدِ مِنْ بَيْتِكَ الْحَرَامِ উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা লা তাঝআল হাজা আখিরাল আহদি মিন বাইতিকাল হারাম।’ অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আপনার পবিত্র ঘরের সঙ্গে এ সাক্ষাৎকে আমাদের শেষ সাক্ষাৎ বানাবেন না।’



