মৃত্যুর পর মানুষ কী রেখে যেতে চায়? সম্পদ, স্মৃতিচিহ্ন, নাকি নিজের মূল্যবোধ? মনোবিজ্ঞানী ও গবেষকদের মতে, উত্তরাধিকার বা ‘লিগ্যাসি’ রেখে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা মানুষের গভীর এক মানসিক চাহিদা, যা মৃত্যুভয়, জীবনের অর্থ খোঁজা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের ইচ্ছার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
উত্তরাধিকারের সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ
যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইওর বোলিং গ্রিন স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক বেথ হান্টারের ভাষায়, মানুষ সচেতন হোক বা না হোক, প্রত্যেকেই কোনো না কোনো উত্তরাধিকার রেখে যায়। তবে উত্তরাধিকার বলতে শুধু সম্পদ বা বিখ্যাত কোনো সৃষ্টি নয়; এর মধ্যে রয়েছে মানুষের শরীর, মূল্যবোধ, অভিজ্ঞতা ও প্রভাবও।
গবেষকেরা সাধারণত উত্তরাধিকারকে তিন ভাগে ভাগ করেন—জৈবিক, বস্তুগত এবং মূল্যবোধভিত্তিক উত্তরাধিকার। জৈবিক উত্তরাধিকার সন্তান বা জিনগত ধারাবাহিকতার মাধ্যমে প্রবাহিত হতে পারে। আবার কেউ কেউ মৃত্যুর পর অঙ্গ বা পুরো দেহ চিকিৎসাবিজ্ঞান ও গবেষণার জন্য দান করেন। যুক্তরাষ্ট্রে কোটি কোটি মানুষ অঙ্গদাতা হিসেবে নিবন্ধিত। অনেকের কাছে এটিও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অর্থবহ কিছু রেখে যাওয়ার একটি উপায়।
অভিজ্ঞতা ও মূল্যবোধের গুরুত্ব
ক্যান্সারজয়ী নারী কিংবা গুরুতর রোগে আক্রান্ত অনেক মানুষও মনে করেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের মানুষকে সচেতন ও উপকৃত করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিজের জীবন থেকে কিছু শিক্ষা বা প্রভাব রেখে যাওয়ার অনুভূতি মৃত্যুভয় কমাতে সাহায্য করে।
জীবনের শেষ পর্যায়ে থাকা রোগীদের জন্য অনেক হাসপাতালে ‘লিগ্যাসি অ্যাক্টিভিটি’ চালু রয়েছে। এর মধ্যে আছে ডায়েরি লেখা, স্মৃতিচারণমূলক অ্যালবাম তৈরি, প্রিয়জনকে চিঠি লেখা বা নিজের মূল্যবোধ নিয়ে ‘নৈতিক উইল’ তৈরি করা। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এসব কার্যক্রম হতাশা ও উদ্বেগ কমাতে এবং মৃত্যুকে গ্রহণ করতে সহায়তা করে।
তবে গবেষকদের মতে, মানুষ সবচেয়ে বেশি যে উত্তরাধিকার রেখে যেতে চায়, তা হলো তার মূল্যবোধ। দয়া, সহানুভূতি, সততা কিংবা অন্যের জন্য কাজ করার মতো বিশ্বাস ও জীবনদর্শনই অনেকের কাছে সবচেয়ে মূল্যবান উত্তরাধিকার। গবেষণায় অংশ নেওয়া বয়স্ক ব্যক্তিরা বলেছেন, নিজেদের অভিজ্ঞতা ও জীবনসংগ্রামের গল্প ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারা তাঁদের মানসিক শান্তি দিয়েছে।
উত্তরাধিকারের মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি
উত্তরাধিকার নিয়ে আধুনিক গবেষণার সূত্রপাত মনোবিশ্লেষক এরিক এরিকসনের ‘জেনারেটিভিটি’ ধারণা থেকে। তাঁর মতে, মানুষ স্বাভাবিকভাবেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণে অবদান রাখতে চায়। পরবর্তী গবেষকেরা দেখিয়েছেন, এই প্রবণতা শুধু মধ্যবয়সের নয়, বরং সারা জীবনের একটি মানসিক প্রক্রিয়া।
ডিউক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক কিম্বারলি ওয়েড বেনজনি মনে করেন, উত্তরাধিকার গড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হলো মৃত্যুচিন্তা। মানুষ যখন নিজের মৃত্যুর কথা উপলব্ধি করে, তখন সে চায় তার অস্তিত্বের কিছু অংশ ভবিষ্যতেও টিকে থাকুক। অন্যদিকে মনোবিজ্ঞানী জেসে বেরিংয়ের মতে, মানুষ নিজের জীবনকে একটি অর্থপূর্ণ গল্প হিসেবে দেখতে চায় এবং সেই গল্পের শিক্ষা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষাই উত্তরাধিকার ভাবনার জন্ম দেয়।
সতর্কতা ও ইতিবাচক দিক
তবে গবেষকেরা সতর্কও করেছেন। মৃত্যুর পর মানুষ কীভাবে স্মরণ করবে, তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কারও পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ উত্তরাধিকারের ব্যাখ্যা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে যারা তা গ্রহণ করবে তাদের ওপর।
তারপরও উত্তরাধিকার নিয়ে চিন্তার ইতিবাচক দিক রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা জীবনের শুরু থেকেই কী ধরনের উত্তরাধিকার রেখে যেতে চান তা নিয়ে ভাবেন, তারা পরিবেশ রক্ষা, দাতব্য কাজ, চিকিৎসা গবেষণায় সহায়তা কিংবা সমাজের কল্যাণে উদ্যোগ নেওয়ার মতো কাজে বেশি সম্পৃক্ত হন।
অর্থাৎ উত্তরাধিকার শুধু মৃত্যুর পরের বিষয় নয়; এটি জীবিত অবস্থাতেই মানুষকে উদ্দেশ্য, অর্থ ও দায়িত্ববোধের অনুভূতি দেয়। আর সেই কারণেই হয়তো মানুষ চায়, মৃত্যুর পরও কোনো না কোনোভাবে বেঁচে থাকতে—অন্যের স্মৃতিতে, মূল্যবোধে কিংবা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনে।



