মানুষ জন্মগতভাবেই অভাবী। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে সে কারও না কারও সাহায্যের মুখাপেক্ষী। কখনো হেদায়াতের প্রয়োজন, কখনো রিজিকের, কখনো নিরাপত্তার, কখনো সম্মান ও মর্যাদার। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমরা অনেক সময় প্রয়োজন পূরণের জন্য মানুষের দরজায় মাথা নত করি, অথচ সব কিছুর মালিক ও নিয়ন্ত্রক মহান রবের দিকে ফিরে যাই না। অথচ সব প্রয়োজন পূরণের দরজা একটাই।
সকল প্রয়োজন পূরণের মালিক আল্লাহ
ইসলাম আমাদের শেখায়, সকল প্রয়োজনের প্রকৃত মালিক একমাত্র আল্লাহ। তিনি হেদায়াত দেন, তিনি রিজিক দেন, তিনি সম্মান দেন, তিনিই বিপদ দূর করেন। তাই একজন মুমিনের প্রথম ও শেষ ভরসা হওয়া উচিত তারই দরবার। একটি মহান হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা তার বান্দাদের উদ্দেশে বলেন—
يَا عِبَادِي كُلُّكُمْ ضَالٌّ إِلَّا مَنْ هَدَيْتُهُ فَاسْتَهْدُونِي أَهْدِكُمْ، وَكُلُّكُمْ جَائِعٌ إِلَّا مَنْ أَطْعَمْتُهُ فَاسْتَطْعِمُونِي أُطْعِمْكُمْ، وَكُلُّكُمْ عَارٍ إِلَّا مَنْ كَسَوْتُهُ فَاسْتَكْسُونِي أَكْسُكُمْ
‘হে আমার বান্দারা! তোমরা সবাই পথভ্রষ্ট, তবে সে নয় যাকে আমি হেদায়াত দান করেছি। অতএব তোমরা আমার কাছেই হেদায়াত চাও, আমি তোমাদের হেদায়াত দান করব। তোমরা সবাই ক্ষুধার্ত, তবে সে নয় যাকে আমি আহার দিয়েছি। অতএব তোমরা আমার কাছেই খাদ্য চাও, আমি তোমাদের খাদ্য দান করব। তোমরা সবাই বিবস্ত্র, তবে সে নয় যাকে আমি পোশাক পরিয়েছি। অতএব তোমরা আমার কাছেই পোশাক চাও, আমি তোমাদের পোশাক দান করব।’ (মুসলিম ২৫৭৭)
এই হাদিস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের নিজের কোনো ক্ষমতা নেই। আমরা যা কিছু পেয়েছি, সবই আল্লাহর অনুগ্রহ।
হেদায়াতের দরজা তার কাছেই
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নিয়ামত হলো হেদায়াত। সম্পদ, খ্যাতি কিংবা ক্ষমতা নয়; বরং সঠিক পথের সন্ধানই মানুষের প্রকৃত সফলতা। আল্লাহ তাআলা বলেন—
مَنْ يَهْدِ اللَّهُ فَهُوَ الْمُهْتَدِ ۖ وَمَنْ يُضْلِلْ فَلَنْ تَجِدَ لَهُ وَلِيًّا مُرْشِدًا
‘আল্লাহ যাকে হেদায়াত দেন, সেই প্রকৃত পথপ্রাপ্ত। আর যাকে তিনি পথভ্রষ্ট করেন, তার জন্য তুমি কোনো পথপ্রদর্শক পাবে না।’ (সুরা আল-কাহফ: আয়াত ১৭)
তাই হেদায়াতের জন্য সর্বদা আল্লাহর কাছেই প্রার্থনা করতে হবে। প্রতিদিনের সালাতে আমরা বারবার বলি—
اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ
‘আমাদের সরল পথ প্রদর্শন করুন।’ (সুরা আল-ফাতিহা: আয়াত ৬)
রিজিকের চাবিকাঠিও তার হাতে
মানুষ জীবিকার জন্য নিরলস পরিশ্রম করে। কিন্তু পরিশ্রমই রিজিকের নিশ্চয়তা নয়; রিজিকের ফয়সালা করেন আল্লাহ। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَمَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا
‘পৃথিবীতে এমন কোনো প্রাণী নেই যার রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর নেই।’ (সুরা হুদ: আয়াত ৬)
অতএব রিজিকের সংকীর্ণতায় হতাশ না হয়ে আমাদের উচিত আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দোয়া করা এবং তার ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা।
সম্মান, নিরাপত্তা ও আশ্রয়ের উৎসও একমাত্র আল্লাহ
মানুষ দুনিয়ায় সম্মান, মর্যাদা ও নিরাপত্তার সন্ধান করে। কিন্তু প্রকৃত সম্মান কারও হাতে নয়; তা একমাত্র আল্লাহর দান। আল্লাহ তাআলা বলেন—
مَنْ كَانَ يُرِيدُ الْعِزَّةَ فَلِلَّهِ الْعِزَّةُ جَمِيعًا
‘যে সম্মান কামনা করে, জেনে রাখুক— সমস্ত সম্মান আল্লাহরই।’ (সুরা ফাতির: আয়াত ১০)
যখন মানুষ সব দরজা বন্ধ দেখতে পায়, তখনও আল্লাহর দরজা কখনো বন্ধ হয় না। তিনি শুনেন, তিনি দেখেন এবং তিনি তার বান্দার ডাকে সাড়া দেন।
কেন আল্লাহর কাছেই চাইতে হবে?
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইবনে আব্বাস (রা.)-কে উপদেশ দিয়ে বলেছেন—
إِذَا سَأَلْتَ فَاسْأَلِ اللَّهَ، وَإِذَا اسْتَعَنْتَ فَاسْتَعِنْ بِاللَّهِ
‘যখন কিছু চাইবে, আল্লাহর কাছেই চাও। আর যখন সাহায্য চাইবে, আল্লাহর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করো।’ (তিরমিজি ২৫১৬)
এ শিক্ষা একজন মুমিনকে আত্মমর্যাদাশীল করে এবং তাকে সৃষ্টির পরিবর্তে স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করতে সাহায্য করে।
মানুষের জীবনে প্রয়োজনের শেষ নেই। কিন্তু সেই প্রয়োজন পূরণের প্রকৃত ক্ষমতা কারও হাতে নেই, একমাত্র আল্লাহ ছাড়া। হেদায়াত, রিজিক, পোশাক, সম্মান, নিরাপত্তা, সফলতা—সবকিছুর মালিক তিনি। তাই একজন মুমিনের হৃদয় কখনো মানুষের দরজায় ঝুঁকে পড়ে না; বরং সে বারবার ফিরে যায় তার রবের দরবারে।
আসুন, আমরা জীবনের প্রতিটি চাওয়া-পাওয়া, প্রতিটি সংকট ও প্রতিটি স্বপ্ন নিয়ে আল্লাহর কাছেই হাত তুলি। কারণ তিনিই বলেছেন— চাও, আমি দেব; ডাকো, আমি সাড়া দেব; ফিরে আসো, আমি পথ দেখাব।
فَفِرُّوا إِلَى اللَّهِ
‘অতএব তোমরা আল্লাহর দিকেই ধাবিত হও।’ (সুরা আয-যারিয়াত: আয়াত ৫০)



