জিলহজ মাস ইসলামী বর্ষপঞ্জির অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ মাস। এর প্রথম দশ দিনের ফজিলত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, এমন কোনো দিন নেই যাতে নেক আমল আল্লাহর কাছে জিলহজের প্রথম দশ দিনের আমলের চেয়ে অধিক প্রিয়। (সহিহ বুখারি)
এই বরকতময় দিনগুলোর মধ্যে ৯ জিলহজ, অর্থাৎ ইয়াওমে আরাফাহ, বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। এদিন লাখো হাজি আরাফার ময়দানে অবস্থান করেন। তবে মুসলিম বিশ্বে প্রতি বছর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে: আরাফার রোজা কি নিজ দেশের চাঁদ অনুযায়ী রাখতে হবে, নাকি সৌদি আরবে হাজিদের আরাফায় অবস্থানের দিন অনুযায়ী?
আরাফার রোজার ফজিলত
রাসূলুল্লাহ (সা.) আরাফার রোজার ফজিলত সম্পর্কে বলেছেন, আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আরাফার দিনের রোজা পূর্বের এক বছর এবং পরবর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে। (সহিহ মুসলিম) এই হাদিসের কারণেই আরাফার রোজা মুসলিম উম্মাহর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নফল ইবাদত হিসেবে বিবেচিত।
ইয়াওমে আরাফাহ নির্ধারণের ভিত্তি
ফিকহি আলোচনায় মূল প্রশ্ন হলো ‘ইয়াওমে আরাফাহ’ নির্ধারণের ভিত্তি কী? স্থানীয় চাঁদ, নাকি আরাফার ময়দানে হাজিদের অবস্থান? চার মাযহাবের ইমাম ও ফকিহদের আলোচনায় দেখা যায়, অধিকাংশ আলেম চাঁদ দেখার স্থানীয় পার্থক্যকে শরিয়তসম্মত হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
হানাফি মাযহাব
হানাফি মাযহাবের ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর ফিকহি নীতিতে স্থানীয় চাঁদ দেখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। হানাফি ফিকহের বহু গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, দূরবর্তী অঞ্চলে চাঁদ দেখার ভিন্নতা গ্রহণযোগ্য হতে পারে। ‘আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা’ ও ‘বাদায়েউস সানায়ে’ গ্রন্থে এ বিষয়ে আলোচনা পাওয়া যায়।
মালিকি মাযহাব
মালিকি মাযহাবের ইমাম মালিক (রহ.)-এর মতানুসারেও বিভিন্ন অঞ্চলে চাঁদ দেখার পার্থক্য বিবেচিত হতে পারে। মালিকি ফকিহরা স্থানীয় বাস্তবতা ও অঞ্চলভিত্তিক চাঁদ দেখাকে গুরুত্ব দিয়েছেন।
শাফেয়ি মাযহাব
শাফেয়ি মাযহাবের ইমাম শাফেয়ি (রহ.) স্পষ্টভাবে বিভিন্ন অঞ্চলের চাঁদ দেখার পার্থক্যকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। ইমাম নববী (রহ.) ‘শরহ সহিহ মুসলিম’-এ উল্লেখ করেন, এক অঞ্চলের চাঁদ দেখা অপর অঞ্চলের জন্য আবশ্যক নয় বিশেষত যখন ভৌগোলিক দূরত্ব অনেক বেশি হয়। শাফেয়ি মাযহাবে এ মতটি অত্যন্ত প্রসিদ্ধ।
হাম্বলি মাযহাব
হাম্বলি মাযহাবের ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) থেকেও এমন মত পাওয়া যায় যে, বিভিন্ন অঞ্চলের চাঁদ ভিন্ন হতে পারে। পরবর্তী হাম্বলি আলেমদের মধ্যে ইবনে তাইমিয়্যা (রহ.) এবং ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) স্থানীয় চাঁদ দেখার মতকে শক্তিশালী করেছেন।
সমসাময়িক আলেমদের মত
সমসাময়িক যুগের বিশিষ্ট আলেম শাইখ আবদুল আজিজ ইবনে বায (রহ.) এবং শাইখ মুহাম্মদ ইবনে সালিহ আল-উসাইমিন (রহ.) স্থানীয় চাঁদের ভিত্তিতে আরাফার রোজা পালনের পক্ষে মত দিয়েছেন। তাদের মতে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ‘চাঁদ দেখে রোজা রাখো এবং চাঁদ দেখে ঈদ করো’ হাদিসটি রোজা ও ঈদের সময় নির্ধারণের মৌলিক নীতি।
অন্যদিকে কিছু আলেমের মত হলো, ‘ইয়াওমে আরাফাহ’র মূল সম্পর্ক যেহেতু আরাফার ময়দানে হাজিদের অবস্থানের সঙ্গে, তাই সৌদি আরবে যেদিন হাজিরা আরাফায় অবস্থান করবেন, সেদিনই রোজা রাখা উত্তম। তবে অধিকাংশ ফকিহ এই মতকে তুলনামূলক দুর্বল বা সীমিত মত হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের অধিকাংশ আলেম, মুফতি ও ইসলামিক গবেষক স্থানীয় চাঁদের ভিত্তিতে ৯ জিলহজ অনুযায়ী আরাফার রোজা রাখার পক্ষেই মত দিয়েছেন। ফলে বাংলাদেশে ঘোষিত ৯ জিলহজেই রোজা পালন করাই অধিক প্রচলিত ও গ্রহণযোগ্য আমল।
আরাফার রোজার আধ্যাত্মিক শিক্ষা
মূলত আরাফার রোজার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো তাকওয়া, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ। এই রোজা শুধু একটি তারিখের প্রশ্ন নয়, বরং এটি মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করার এক আধ্যাত্মিক ইবাদত। আজকের বিভক্ত, ভোগবাদী ও আত্মকেন্দ্রিক পৃথিবীতে আরাফার রোজা মুসলমানদের মনে করিয়ে দেয় প্রকৃত সফলতা সম্পদ বা ক্ষমতায় নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে। তাই এই ইবাদতের প্রকৃত চেতনা হওয়া উচিত তাকওয়া, তওবা, বিনয় ও উম্মাহর ঐক্য রক্ষা করা, বিভেদ সৃষ্টি করা নয়।



