মৃত্যুতে উল্লাস: শ্যাডনফ্রয়েড থেকে স্যাডিজমের পথে সমাজ
মৃত্যুতে উল্লাস: শ্যাডনফ্রয়েড থেকে স্যাডিজমের পথে

মানুষের মৃত্যুতে মানুষ কাঁদবে—এটাই চিরন্তন। মৃত ব্যক্তি আত্মীয় বা বন্ধু না হলেও মানুষ দুঃখিত হয়। এমনকি চেনা-জানার বাইরে একেবারে অপরিচিত কারও মৃত্যুসংবাদ শুনলেও অবচেতনভাবেই আমরা পড়ে উঠি—‘ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’। একসময় আমাদের সমাজেই এটাই ছিল স্বাভাবিক প্রচলিত রীতি-নীতি, মানুষের চিরায়ত সহানুভূতির সংস্কৃতি।

কিন্তু আজ সেই মৃত্যু যদি কারও আনন্দের খোরাক জোগায়, মৃত্যু যদি উল্লাসের উপলক্ষ হয়ে ওঠে—তখন বুঝতে হবে সমাজ এক অদৃশ্য ও ভয়ানক মহামারিতে আক্রান্ত। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই অন্ধকার উল্লাসের নাম ‘শ্যাডনফ্রয়েড’।

শ্যাডনফ্রয়েড কী?

শ্যাডনফ্রয়েড একটি জার্মান শব্দ। এখানে ‘শ্যাডন’ মানে ক্ষতি এবং ‘ফ্রয়েড’ মানে আনন্দ। অর্থাৎ কারও ক্ষতি, পতন বা বিপদে অবচেতনভাবে আনন্দ পাওয়ার অদ্ভুত মানসিক অনুভূতিই হলো শ্যাডনফ্রয়েড। সহজভাবে বললে, একজন জনপ্রিয় বা সফল মানুষ যখন হঠাৎ কোনও বিতর্কে জড়ান বা মারা যান, তখন সাধারণ মানুষের মনে যে এক ধরনের গোপন তৃপ্তি বা ‘বেশ হয়েছে’ ভাব আসে, সেটাই শ্যাডনফ্রয়েড।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কেন্টাকি ইউনিভার্সিটির সামাজিক মনোবিজ্ঞানী ড. রিচার্ড এইচ. স্মিথ একে ব্যাখ্যা করেছেন মানুষের সামাজিক তুলনা এবং আত্মমর্যাদাবোধের তীব্র অভাব দিয়ে। মানুষ যখন নিজের জীবন নিয়ে অসন্তুষ্ট থাকে, প্রতিনিয়ত হীনম্মন্যতায় ভোগে, তখন অন্য কোনও সফল মানুষের পতন দেখলে তার অবচেতন মন মনে করে, ‘যাক, ও তো তাহলে আমার চেয়ে ভালো অবস্থানে নেই।’ এটি তার ভেতরের হীনম্মন্যতাকে সাময়িক উপশম দেয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

স্যাডিজম: শ্যাডনফ্রয়েডের চেয়ে ভয়াবহ

তবে বর্তমান পরিস্থিতি এখানেই থেমে নেই। সাইকোলজির পরিভাষায় ‘স্যাডিজম’ নামক ধারণাটি শ্যাডনফ্রয়েডের চেয়ে আরও কয়েক ধাপ বেশি হিংস্র ও আগ্রাসী। শ্যাডনফ্রয়েডে মানুষ কেবল দূর থেকে অন্যের কষ্ট দেখে পরোক্ষ আনন্দ পায়। কিন্তু স্যাডিজমে মানুষ নিজে সক্রিয় হয়ে ওঠে, অন্য মানুষকে নিজে কষ্ট দিয়ে, অপমান করে বা তার ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে যে বিকৃত আনন্দ পাওয়া যায়, তাকেই স্যাডিজম বলে।

কারিনা কায়সারের মৃত্যুর পর সোশ্যাল মিডিয়ায় তাকে নিয়ে যে ধরনের কুৎসিত ট্রল ও উল্লাস হচ্ছে, সেসব দেখে আজ আমার কেবলই মনে হচ্ছে—আমরা তাহলে এ কোন যুগে বসবাস করছি? আমরা কি শুধু শ্যাডনফ্রয়েডের স্তরেই আটকে আছি, নাকি আমরা ধীরে ধীরে এক একটি হিংস্র ‘স্যাডিস্টে’ পরিণত হচ্ছি?

কারিনা কায়সারের ঘটনা

এই মনস্তাত্ত্বিক বিকৃতির চরম রূপ আমরা দেখছিলাম—কারিনা কায়সার অসুস্থ হয়ে যাওয়ার পর থেকেই। একদল মানুষ তাকে এবং তার পরিবারকে সামনাসামনি তো বটেই, সোশ্যাল মিডিয়ায় এসেও প্রতিনিয়ত এমন সব নির্মম কমেন্ট করছিলেন, যাতে তিনি এবং তার পরিবার মানসিকভাবে ক্ষতবিক্ষত হন। এমনকি তার মৃত্যুর পর এই দলটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যেই ‘আলহামদুলিল্লাহ’ পড়ছেন, রীতিমতো তারা খুশি হয়েছেন বলে জানান দিচ্ছেন।

কেন, কী করেছেন কারিনা কায়সার?

অনেকেই বলছেন, তিনি জুলাই আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন, তাই বিপক্ষের লোকজন আজ তাকে গালি দিচ্ছেন, তার মৃত্যুতে উৎসব করছেন। অথচ তিনি অসুস্থ হওয়ার পর আমি তার বেশ কিছু ভিডিও দেখলাম। বেশ উচ্ছল, প্রাণবন্ত ও হাসিখুশি একজন মেয়ে। তার মা এক ভিডিওতে বলেছিলেন, আন্দোলনের সময় যেদিন গণভবন লুট হচ্ছিল, সেদিন ওই রাস্তা দিয়ে তারাও যাচ্ছিলেন। তাদের হাতে থাকা সাধারণ ব্যাগ ও পরা চুরি উঁচিয়ে ধরে তারা জাস্ট একটা ‘ফান’ বা কৌতুক করছিলেন যে এগুলো তারা গণভবন থেকে নিয়ে এসেছেন। আসলে তারা গণভবন লুট করেননি, সেটা ছিল একমুহূর্তের নিছক রসিকতা। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার আদালত সেই রসিকতাকেই অপরাধের চূড়ান্ত রায় বানিয়ে দিলো।

আমি কারিনা কায়সারের আরেকটি ভিডিও খুব মনোযোগ দিয়ে দেখেছি, যেখানে তিনি অত্যন্ত দায়িত্বশীল নাগরিকের মতো বলছিলেন—‘এই যে গণভবন লুট, মেট্রোরেলে আগুন, সংসদ ভবনে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যুরালগুলো ভাঙা—এগুলো ঠিক হয়নি। এগুলো আমাদের দেশেরই সম্পদ। আমরা তো নতুন দেশ গড়বো। তাহলে দেশের সম্পদ নষ্ট করছি কেন?’ অদ্ভুত এক অন্ধ সমাজ আমাদের! কারিনার এই যৌক্তিক ও দেশপ্রেমী কথার কোনও প্রতিধ্বনি কোথাও শুনলাম না, অথচ একটা মুহূর্তের ভুলকে পুঁজি করে তার মৃত্যুকে উদযাপন করতে হলো।

সুবর্ণা মুস্তাফার প্রসঙ্গ

প্রখ্যাত অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তাফার একটি সাক্ষাৎকারের কথা মনে পড়ছে। প্রয়াত কিংবদন্তি অভিনেতা হুমায়ুন ফরিদীকে নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে সুবর্ণা মুস্তাফা অত্যন্ত চমৎকার একটি কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি তার সমালোচনা করবো না। কারণ এখানে ওর হয়ে কথা বলার কেউ নেই।’ যদিও হুমায়ুন ফরিদীকে ছেড়ে আসার চার বছর পর তার মৃত্যু হয় এবং সেই মৃত্যুর জন্য অনেকেই সুবর্ণাকেই দোষ দেন। তবু সুবর্ণা ফরিদীকে নিয়ে কোনও অভিযোগ করেননি। কারণ ওই একটাই-মৃত্যুর পর হুমায়ুন ফরিদীর হয়ে কথা বলার তো কেউ নেই। অথচ তার মৃত্যুর দায়ভার অনেকটাই এখনও বয়ে বেড়াচ্ছেন সুবর্ণা। অথচ একসঙ্গে না থাকার পেছনে দুজনেরই তো কিছু না কিছু ভুল-ক্রটি থাকে।

অথচ আজ আমরা যেন কারও এই ‘অনুপস্থিতি’টাকেই সবচেয়ে বড় সুযোগ হিসেবে ধরে নিই। মনস্তত্ত্বটা এমন—‘সে তো এখন আর নেই, নিজের পক্ষে সাফাই গাইতে পারবে না। এই তো সুযোগ! এই সুযোগে তার যত পারি সমালোচনা করি, মন খুলে গালিগালাজ করি। বেঁচে থাকতে তো সামনাসামনি বলতে পারি নাই, এখন তাকে হেয় করি, অপমান করি।’ ঠিক এই বিকৃত মানসিকতা নিয়েই আজ আমাদের সমাজ চলছে। একজন মানুষ চলে যাওয়ার পর তার অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে সমাজ এমনভাবে হামলে পড়ছে, যাতে ওপাশে থাকা তার শোকার্ত পরিবারটি মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়ে, তছনছ হয়ে যায়।

কারিনার ব্যক্তিগত জীবন ও সংগ্রাম

আচ্ছা, রাজনীতির বাইরেও কি কারিনা কায়সারের বিরুদ্ধে কোনও আক্রোশ ছিল? জুলাই আন্দোলনের পক্ষে কথা বলা ছাড়া আর কী করেছেন কারিনা কায়সার? তিনি একটা মুভি করেছেন, যার নাম ‘৩৬ ২৪ ৩৬’। সিনেমাটি আমার দেখার সুযোগ হয়নি, তবে আমার স্বামী দেখতে বলেছিলেন। তিনি কিছুটা দেখে বলেছিলেন, মুভিটি মূলত ‘বডি শেমিং’ বা শারীরিক গঠন নিয়ে সমাজে যে কটূক্তি করা হয়, তার বিরুদ্ধে একটা ইতিবাচক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে।

কারিনা কায়সার শারীরিকভাবে কিছুটা স্থূলকায় বা ‘হেলদি’ ছিলেন। আর সে কারণেই হয়তো তিনি এই মুভিটির চিত্রনাট্য তৈরি থেকে শুরু করে অভিনয় পর্যন্ত করতে গভীর উৎসাহ দেখিয়েছিলেন। কারণ আমাদের এই তথাকথিত আধুনিক সমাজে একজন নারীকে এখনও মাপা হয় ‘আদর্শিক শরীরের মাপ’ দিয়ে। আমরা মানুষের কাজ, প্রতিভা বা ব্যক্তিত্বকে তার মেধা দিয়ে নয়, বরং তার শরীরের চামড়া আর ওজন দিয়ে মূল্যায়ন করি। নিশ্চয়ই নিজের এই শরীর নিয়ে বাস্তব জীবনেও কারিনাকে কম ট্রল ও বুলিংয়ের শিকার হতে হয়নি!

এর ওপর তিনি ছিলেন সাবেক জাতীয় ফুটবলার কায়সার হামিদের মেয়ে এবং দাবার রানি রানী হামিদের নাতনি। পারিবারিক ঐতিহ্য আর আভিজাত্য তাঁর আগে থেকেই ছিল। সেই সঙ্গে নিজের স্থূল শরীরকে জয় করে তিনি যেভাবে একজন সফল কনটেন্ট ক্রিয়েটর, ইউটিউবার ও সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার হিসেবে নিজের ক্যারিয়ার গড়লেন—তাও কি আমাদের চারপাশের মানুষের তীব্র ঈর্ষার কারণ ছিল না?

ঈর্ষার রূপান্তর ও এভরিডে স্যাডিজম

এখানেই ড. রিচার্ড স্মিথের সেই ‘ঈর্ষার রূপান্তর’ তত্ত্বটি মিলে যায়। নিজেরা তো কিছু করতে পারছি না, তাহলে অন্য কেউ কেন এত ভালো থাকবে বা এত সফল হবে! এই ঈর্ষা, পরশ্রীকাতরতা, হিংসা আর রাজনৈতিক বিভাজন আমাদের, আমাদের সমাজকে এক অতল গহ্বরের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

আমরা মানুষ হিসেবে দিন দিন কতটা নিচে নেমে যাচ্ছি, তা কি আমরা একটুও ভেবে দেখছি? আমরা প্রতিনিয়ত নিজেদের জীবনের হীনম্মন্যতায় ভুগছি। আমরা নিজেরা ভালো নেই, আমাদের ভেতরে কোনও শান্তি নেই। আর সেই ভেতরের শূন্যতা ঢাকতেই আজ আমাদের একজন মৃত বা অসুস্থ মানুষকে দেখে আনন্দ পেতে হয়। মৃত মানুষের সমালোচনা করে আমাদের মানসিকভাবে তৃপ্তি খুঁজতে হয়।

সাম্প্রতিক গবেষণায় মনোবিজ্ঞানীরা এ ধরনের আচরণের জন্য একটি নতুন টার্ম ব্যবহার করছেন—‘এভরিডে স্যাডিজম’। সোশ্যাল মিডিয়ার পর্দার আড়ালে লুকিয়ে থাকা ট্রলকারীরা মূলত এই এভরিডে স্যাডিজমে ভুগছে। তারা হয়তো ক্লিনিকালি কোনও উন্মাদ বা লকআপে রাখার মতো মানসিক রোগী নয়—কিন্তু সামাজিক, নৈতিক এবং মানবিক মাপকাঠিতে তারা অবশ্যই মারাত্মক মনস্তাত্ত্বিক বিকৃতি ও চরম আধ্যাত্মিক দেউলিয়াত্বের শিকার।