মিরপুর শাহ আলী মাজার হামলা: বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা
মিরপুর শাহ আলী মাজার হামলা: বিচারহীনতার সংস্কৃতি

সম্প্রতি (১৪ মে ২০২৬ রাতে) মিরপুরের হযরত শাহ আলী বোগদাদী (রহ.)-এর মাজারে হামলা চালানো হয়। ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর মাজারে পৌঁছে দেখা যায়, প্রাঙ্গণে দেড়-দু'হাজার মানুষ জড়ো হয়েছে। খাদেম, ভক্ত, পাগল, প্রতিবেশী, কৌতূহলী পথচারী, কয়েকজন সাংবাদিক ও কন্টেন্ট ক্রিয়েটর উপস্থিত ছিলেন। তার আগে হামলার মুহূর্তেও অন্তত হাজারখানেক মানুষ ছিলেন। দেড়শ মুখোশধারী লাঠি-পাইপ নিয়ে মাজারে প্রবেশ করে, আর প্রতিরোধে দাঁড়িয়েছিলেন কেবল মাজারের ‘পাগলেরা’। সেই পাগল, ভদ্রসমাজ যাদের কথা বলতেই চায় না।

হামলা কীভাবে সম্ভব হলো?

এত মানুষ থাকার পরেও হামলা সম্ভব হলো পূর্বের অভিজ্ঞতার কারণে। বিচারহীনতা তো আছেই, পালটা আঘাতও যেন না আসে, সেটা হামলাকারীরা জানতো। এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমল থেকে চলে আসা মাজার ভাঙার ধারাবাহিকতা। মাজার ভাঙা এতোটাই স্বাভাবিক ঘটনায় রূপান্তরিত হয়েছে যে, গুগলে ‘মাজার’ লিখে সার্চ করলে সাজেশন আসে ‘মাজার ভাঙা’।

গবেষণার তথ্য

‘মাকাম: সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ’-এর গবেষণায় দেখা যায়, ওই সময়ে ৯৭টি মাজারে হামলা করা হয়। ১৭ মাসে ৩ জন নিহত ও ৪৬৮ জন আহত হন। কিছু ক্ষেত্রে বুলডোজার দিয়ে স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, শেরপুরের মুর্শিদপুর দরবার পুড়েছে, রাজবাড়ীর নুরা পাগলার কবর খুঁড়ে লাশ মহাসড়কে পোড়ানো হয়েছে। সিলেটের শাহপরান (রহ.)-এর দরগাহে প্রায় ৭০০ বছর ধরে চলা ওরস সহ বহু জায়গায় ওরস বন্ধ করা হয়েছে প্রশাসনের সহায়তায়। বিভিন্ন স্থানে পুলিশ-সেনাবাহিনী-র্যাবের সামনেই লুটপাট হয়েছে, দরবারে আগুন ধরানো হয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মামলা ও বিচারহীনতা

এতগুলো হামলার বিপরীতে মাত্র ১১টি মামলা দায়ের হয়। তন্মধ্যে ১০টি তদন্তের কোনো উন্নতি নেই। সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যর্থ।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাজনৈতিক বয়ান

হামলার পরের রাজনৈতিক বয়ান বিস্ময়কর। সেই আসনের নবনির্বাচিত সাংসদ পুলিশের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ঘটনাটি ছিল একটি ‘মাদকবিরোধী অভিযান’। অথচ ডিএমপি মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনার নিজেই প্রথম আলোকে স্পষ্ট করে বলেছেন, পুলিশ মাজারে কোনো অভিযান চালায়নি, হামলা চালিয়েছে জামায়াত-শিবিরের একটি অংশ। দারুসসালাম জোনের সহকারী কমিশনার ও শাহ আলী থানার ওসিও একই কথা বলেছেন। অর্থাৎ একজন জনপ্রতিনিধি, পুলিশের নাম ভাঙিয়ে, একটি সংগঠিত হামলাকে রাষ্ট্রীয় অভিযানের পোশাক পরাতে চেয়েছেন। এ মিথ্যা নিছক ব্যক্তিগত ভুল নয়, এটি বিচারহীনতার একটি নতুন কৌশল, যে কৌশলে ‘অপরাধ’–কে আইনি অভিযান বলে চালিয়ে দেওয়া যায়।

মাজার ভাঙার যুক্তি

মাজার ভাঙার ক্ষেত্রে যে কারণ দেখিয়ে ‘হামলায় ন্যায্যতা’ তৈরি করা হয়, তা হলো ‘গাঁজা’ ও ‘পাগল’। অথচ, হামলার বিভিন্ন ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ‘গাঁজা’ বা ‘পাগল’-এর যুক্তি ভেঙে পড়ে। যেমন, মুর্শিদপুর দরবারে কোনো মাজারই নেই, ‘গাঁজা’ও নেই। তবু সেখানে হামলা হলো। ঈদে মিলাদুন্নবীর জশনে জুলুসের মিছিলেও গাঁজা সেবন হচ্ছিল না, তবুও হামলা হয়েছে। এ-পর্যন্ত যত হামলা হয়েছে, তার সবগুলোই সংগঠিত এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক। যে ধরনের মাজারই হোক, ভাঙার মানসিকতাটি অভিন্ন।

সাংস্কৃতিক ও কাঠামোগত কারণ

এই মানসিকতা একদিনে গড়েনি এবং একদিনে থামবেও না। অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ব্রোকেন উইন্ডোস’-এর প্রভাব বলা যেতে পারে। একটি ভাঙা জানালা মেরামত না হলে আশেপাশের আরও জানালা ভাঙার সম্ভাবনা বাড়ে। এক বছর ধরে ভাঙা পড়ে-থাকা একটি মাজার পরের ‘মাজার ভাঙা’–কে স্বাভাবিক করে তোলে। মাজারের হামলার বিষয়টিকে কেবল একটি ধর্মীয় স্থাপনার নিরাপত্তা-সংকট ভাবলে ভুল হবে। একইসাথে এটি জননিরাপত্তার সংকট, রাষ্ট্রের বয়ান-একচেটিয়া হয়ে উঠার সংকট এবং সর্বোপরি, নতুন বাংলাদেশের যে স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম, সেই স্বপ্নেরও হোঁচট! যেখানে অপরাধ দৃশ্যমান অথচ বিচার অদৃশ্য, সেখানে পরবর্তী অপরাধ কেবল সময়ের ব্যাপার। লরেন্স ই. কোহেন ও মার্কাস ফেলসন অপরাধ সংঘটিত হওয়ার জন্য যে তিনটি উপাদানের কথা বলেন, অর্থাৎ, অপরাধ প্রবণতা, সহজ শিকার ও বাঁধার অভাব, এই তিনটিই এখন দেশে একসাথে আছে।

পাঠ্যপুস্তকের ভূমিকা

অনেক সময় অপরাধের বৈধতাও আসে সামাজিকভাবে। ফলে, বিচারহীনতা শুধু কাঠামোগত নয়, সাংস্কৃতিকও। এর কারণটা অনেক গভীরে প্রোথিত। বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তকে ছোট ক্লাস থেকেই বাংলা সাহিত্যে এমন কিছু পাঠ পড়ানো হয়, যেগুলোতে মাজার সম্পর্কে কেবল নেতিবাচক দিকটারই শিক্ষা দেওয়া হয়। যেমন, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র লালসালুতে দেখা যায় মজিদের ভণ্ডামি, বহিপীর-এ এক বিপত্নীক বৃদ্ধের লোভ, মোজাম্মেল হকের হুজুর কেবলায় পবিত্রতার আড়ালে কপটতা। রচনাগুলো নিঃসন্দেহে অসাধারণ সাহিত্যকর্ম কিন্তু, পাঠ্যসূচির ভেতরে এগুলোর পাশে সুফি ঐতিহ্যের ইতিবাচক পাঠ ও বাংলার সমন্বয়বাদী ঐতিহ্যের ইতিহাসের অনুপস্থিতির কারণে শিক্ষার্থীর মনে এক-চক্ষু সমীকরণ গাঁথা হয়ে যায়। মাজার মানে ভণ্ডামি, পীর মানে শোষণ, ভক্তি মানে অজ্ঞতা। তারপর সে যখন শোনে ‘তৌহিদী জনতা’র ওয়াজ, তখন এক ধরনের মানসিক সাযুজ্য তৈরি হয়: ‘হ্যাঁ, ভাঙাই তো উচিত।’ ফলে, শিশু কিশোরদের বেড়ে উঠা ও সামাজিকীকরণের মধ্যে মাজার–বিরোধিতা বেশ গভীরভাবে প্রোথিত হয়ে আছে।

আদর্শিক ইন্ধন

অন্যদিকে, 'শুদ্ধতাবাদী ইসলামের' চোখে মাজার, কাওয়ালি, মোমবাতি, লাল কাপড়, গাছে বাঁধা সুতা 'অসঙ্গতিপূর্ণ'। ফলে এগুলো ভাঙচুরকারীর কাছে আসলে এক ধরনের আনুষ্ঠানিক শুদ্ধিকরণ। এই বিবিধ মিশেলে অপরাধী নিজেকে আর অপরাধী মনে করে না, কারণ সে নিজের কাজকে নৈতিকতার পোশাক পরিয়ে নিয়েছে। তার মনে হয়, ‘শিরক দূর করছি’, ‘শরিয়া কায়েম করছি’, ‘মাদকসেবী সরাচ্ছি’। এই কাজ করতে গিয়ে তারা এটা ভুলে যায় যে, তারা অন্যের নাগরিক অধিকার ক্ষুন্ন করছে। যে অপরাধ একজন সংসদ সদস্য পর্যন্ত করেছেন। একদিকে আদর্শিক ইন্ধন, পাঠ্যসূচির সাংস্কৃতিক বৈধতা, ভিড়ের মনস্তত্ত্ব, রাষ্ট্রীয় বিচারহীনতা, অন্যদিকে কর্মহীন, দিশাহীন, ক্রুদ্ধ একটি বৃহৎ তরুণ-জনসংখ্যা। এ দু’টি স্রোত যেখানে মিলেছে, সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে আজকের শাহ আলী মাজার।

রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা

মাজারে আক্রমণের ক্ষেত্রে, ‘তৌহিদী জনতা’ ব্যানারের কথা বারবার এসেছে। একই সাথে স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও আছে। গত প্রায় দুই বছরে মাজারে হামলাগুলোতে রাজনৈতিক দলগুলোর, বিশেষ করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং বিএনপির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। এগুলোর মূল কারণ আদর্শিক হলেও, অসংগঠিত ভাবে কিছু হয়না। বরং, সংগঠিতভাবেই আদর্শিক হামলা হয়। তার সাথে প্রশাসনিক দুর্বলতা ও স্থানীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্ব মিলে তৈরি হয় সহিংসতা।

প্রতিকারের পথ

মাজার হামলা রোধে সরকারের সক্রিয় ভূমিকাই সবার আগে প্রয়োজন। প্রথমত, একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে হামলার ঘটনায় জড়িতদের পরিচয় প্রকাশ করা ও বিচার করা। দ্বিতীয়ত, সেপ্টেম্বর ২০২৪-এ হাইকোর্ট মাজার রক্ষায় সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে যে রুল জারি করেছিলেন, সেই রুলের জবাব ও পরবর্তী রায় প্রদান করা। তৃতীয়ত, বৃহস্পতিবার রাতের জলসা ও মাজারের ওরস চলাকালে দেশের সমস্ত পরিচিত মাজারে নিয়মিত পুলিশি টহলের ব্যবস্থা করা। চতুর্থত, ওয়াজের-মাইকে এক মুসলিম গোষ্ঠী কর্তৃক অন্য গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণাত্মক বক্তব্য প্রতিরোধে পদক্ষেপ গ্রহণ করা। পঞ্চমত, পাঠ্যপুস্তকে বাংলার সুফি ঐতিহ্যের দিকে আলোকপাত করা। গণমাধ্যমকেও এই হামলা, এবং হামলাপরবর্তী মামলার তদন্ত ও বিচারের অগ্রগতি নিয়ে প্রতিবেদন করার ব্যাপারে সাহসী ভূমিকা নিতে হবে। সবশেষে, মাজারের হামলার বিষয়টিকে কেবল একটি ধর্মীয় স্থাপনার নিরাপত্তা-সংকট ভাবলে ভুল হবে। একইসাথে এটি জননিরাপত্তার সংকট, রাষ্ট্রের বয়ান-একচেটিয়া হয়ে উঠার সংকট এবং সর্বোপরি, নতুন বাংলাদেশের যে স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম, সেই স্বপ্নেরও হোঁচট!