জিলহজ মাস: রহমত, ত্যাগ ও নেক আমলের সোনালি সুযোগ
জিলহজ মাস: রহমত, ত্যাগ ও নেক আমলের সোনালি সুযোগ

ইসলামের বারো মাসের মধ্যে কিছু মাস ও দিন আল্লাহ তাআলা বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। তার মধ্যে জিলহজ মাস একটি অনন্য নেয়ামত ও বরকতময় সময়। এই মাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় হজের পবিত্রতা, হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর অতুলনীয় ত্যাগ এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণের শিক্ষা। জিলহজের প্রথম দশ দিন এতটাই ফজিলতপূর্ণ যে, আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে এর শপথ করেছেন। একজন মুমিনের জন্য এই দিনগুলো আত্মশুদ্ধি, ইবাদত, তওবা ও নেক আমলের সুবর্ণ সুযোগ।

জিলহজের প্রথম দশ দিনের ফজিলত

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: وَالْفَجْرِ ۝ وَلَيَالٍ عَشْرٍ অর্থাৎ 'শপথ ফজরের এবং শপথ দশ রাতের।' (সুরা আল-ফজর: আয়াত ১-২) মুফাসসিরগণের মতে, এখানে 'দশ রাত' বলতে জিলহজের প্রথম দশ রাতকে বোঝানো হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: مَا مِنْ أَيَّامٍ الْعَمَلُ الصَّالِحُ فِيهَا أَحَبُّ إِلَى اللَّهِ مِنْ هَذِهِ الْأَيَّامِ অর্থাৎ 'এমন কোনো দিন নেই, যেসব দিনের নেক আমল আল্লাহর কাছে এই দশ দিনের আমলের চেয়ে অধিক প্রিয়।' (বুখারি ৯৬৯)

জিলহজের গুরুত্বপূর্ণ আমলসমূহ

১. তওবা ও ইস্তিগফার করা

জিলহজ আত্মশুদ্ধির মাস। এই সময়ে অতীতের সব গুনাহের জন্য আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন: وَاسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ ۚ إِنَّ رَبِّي رَحِيمٌ وَدُودٌ অর্থাৎ 'তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, অতঃপর তাঁরই দিকে ফিরে আসো। নিশ্চয়ই আমার রব অতি দয়ালু ও পরম স্নেহশীল।' (সুরা হুদ: আয়াত ৯০)

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

২. জিলহজের প্রথম ৯ দিন রোজা রাখা

এই দিনগুলোর রোজা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। বিশেষত আরাফার দিনের রোজা গুনাহ মাফের অসাধারণ মাধ্যম। হজরত হাফসা (রা.) বলেন: 'রাসুলুল্লাহ (সা.) চারটি আমল কখনো ছাড়তেন না— আশুরার রোজা, জিলহজের প্রথম নয় দিনের রোজা, প্রতি মাসের তিন দিনের রোজা এবং ফজরের আগে দুই রাকাত সুন্নত (নামাজ)।' (আবু দাউদ ২৪৩৭)

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

৩. আরাফার দিনের রোজা

৯ জিলহজ অর্থাৎ আরাফার দিনের রোজা দুই বছরের গুনাহ মাফের কারণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: صِيَامُ يَوْمِ عَرَفَةَ أَحْتَسِبُ عَلَى اللَّهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِي قَبْلَهُ وَالسَّنَةَ الَّتِي بَعْدَهُ অর্থাৎ 'আমি আল্লাহর কাছে আশা রাখি, আরাফার দিনের রোজা বিগত এক বছর ও আগত এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে।' (মুসলিম ১১৬২)

৪. চুল ও নখ না কাটা

যারা কুরবানি করার নিয়ত করেন, তারা জিলহজের চাঁদ ওঠার পর থেকে কুরবানি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত চুল ও নখ না কাটবেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: إِذَا دَخَلَتِ الْعَشْرُ وَأَرَادَ أَحَدُكُمْ أَنْ يُضَحِّيَ فَلَا يَمَسَّ مِنْ شَعْرِهِ وَبَشَرِهِ شَيْئًا অর্থাৎ 'যখন জিলহজের দশক শুরু হবে এবং তোমাদের কেউ কুরবানি করার ইচ্ছা করবে, তখন সে যেন তার চুল ও শরীরের কোনো অংশ না কাটে।' (মুসলিম ১৯৭৭)

৫. বেশি বেশি জিকির করা

জিলহজের এই দিনগুলোতে তাকবির, তাহলিল ও তাহমিদ বেশি বেশি পড়া সুন্নত। আল্লাহ তাআলা বলেন: وَيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ فِي أَيَّامٍ مَعْلُومَاتٍ অর্থাৎ 'এবং তারা নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করবে।' (সুরা আল-হজ: আয়াত ২৮) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: فَأَكْثِرُوا فِيهِنَّ مِنَ التَّهْلِيلِ وَالتَّكْبِيرِ وَالتَّحْمِيدِ অর্থাৎ 'তোমরা এই দিনগুলোতে বেশি বেশি তাহলিল, তাকবির ও তাহমিদ পাঠ কর।' (মুসনাদে আহমাদ ৫৪৪৬)

৬. নফল ইবাদতে যত্নবান হওয়া

এই দিনগুলোতে ফরজ ইবাদতের পাশাপাশি নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা ও রাতের ইবাদতে মনোযোগী হওয়া উচিত। হাদিসে কুদসিতে এসেছে: وَمَا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبَّهُ অর্থাৎ 'আমার বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে, একসময় আমি তাকে ভালোবাসতে শুরু করি।' (বুখারি ৬৫০২)

৭. তাকবিরে তাশরিক আদায় করা

৯ জিলহজ ফজর থেকে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত প্রতি ফরজ নামাজের পর তাকবিরে তাশরিক পড়া ওয়াজিব। তাকবিরটি হলো: اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ وَاللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ وَلِلَّهِ الْحَمْدُ উচ্চারণ: 'আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়ালিল্লাহিল হামদ।' অর্থ: 'আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান। আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান এবং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য।'

৮. দোয়া বৃদ্ধি করা

দোয়া মুমিনের সবচেয়ে বড় শক্তি। এই বরকতময় সময়ে বেশি বেশি দোয়া করা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন: ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ অর্থাৎ 'তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।' (সুরা গাফির: আয়াত ৬০)

৯. সামর্থ্য থাকলে হজ করা

হজ ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ এবং জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইবাদত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: الْحَجُّ الْمَبْرُورُ لَيْسَ لَهُ جَزَاءٌ إِلَّا الْجَنَّةُ অর্থাৎ 'মকবুল হজের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়।' (বুখারি ১৭৭৩)

১০. কুরবানি আদায় করা

কুরবানি হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রিয় জিনিস ত্যাগ করার প্রতীক। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: مَا عَمِلَ ابْنُ آدَمَ يَوْمَ النَّحْرِ عَمَلًا أَحَبَّ إِلَى اللَّهِ مِنْ إِهْرَاقِ الدَّمِ অর্থাৎ 'কুরবানির দিনে পশু জবাই করার চেয়ে আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় কোনো আমল নেই।' (তিরমিজি ১৪৯৩)

১১. আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা

আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ قَاطِعُ رَحِمٍ অর্থাৎ 'আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।' (বুখারি ৫৯৮৪)

১২. গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা

এই মহিমান্বিত দিনগুলোতে সব ধরনের পাপ থেকে দূরে থাকা জরুরি। আল্লাহ তাআলা বলেন: وَذَرُوا ظَاهِرَ الْإِثْمِ وَبَاطِنَهُ অর্থাৎ 'তোমরা প্রকাশ্য ও গোপন সব গুনাহ বর্জন কর।' (সুরা আল-আনআম: আয়াত ১২০)

জিলহজ শুধু একটি মাস নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, ত্যাগ, ইবাদত ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক মহাসুযোগ। এই দিনগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়— দুনিয়ার সব ভালোবাসার ঊর্ধ্বে আল্লাহর সন্তুষ্টিই সর্বোচ্চ লক্ষ্য। তাই আসুন, আমরা এই বরকতময় সময়কে অবহেলায় নষ্ট না করে তওবা, ইবাদত, দোয়া, দান-সদকা ও কুরবানির মাধ্যমে নিজেদের জীবনকে আলোকিত করি। হয়তো এই জিলহজই আমাদের গুনাহ মাফের কারণ হবে, হয়তো এই সিজদাহই বদলে দেবে আমাদের ভাগ্যের লিখন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে জিলহজের মর্যাদা উপলব্ধি করে যথাযথ আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন।