বৃষ্টি মহান আল্লাহ তাআলার অসীম রহমত ও নেয়ামতের একটি অনন্য নিদর্শন। আকাশ থেকে ঝরে পড়া প্রতিটি বৃষ্টির ফোঁটা মানুষের হৃদয়ে প্রশান্তি এনে দেয়, শুকনো জমিনকে সজীব করে তোলে এবং প্রকৃতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার ঘটায়। ইসলামে বৃষ্টিকে শুধু প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে দেখা হয়নি; বরং এটিকে আল্লাহর রহমত, বরকত ও দয়ার প্রকাশ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বৃষ্টির সময় বিশেষ কিছু আমল করতেন এবং গুরুত্বপূর্ণ দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বৃষ্টিকে আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত মনে করতেন এবং এ সময় আল্লাহর স্মরণে মশগুল থাকতেন। তাই একজন মুমিনের জন্যও উচিত বৃষ্টির সময় সুন্নাহ অনুসরণ করা, বেশি বেশি দোয়া করা এবং আল্লাহর রহমতের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।
১. কল্যাণকর বৃষ্টি প্রার্থনা করা
বৃষ্টির সময় আল্লাহর রাসুল (সা.) দোয়া করতেন— اللَّهُمَّ صَيِّبًا نَافِعًا উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা সাইয়্যিবান নাফিআ।’ অর্থ: ‘হে আল্লাহ কল্যাণকর বৃষ্টি দাও।’ (বুখারি ৬৯১) অতিবৃষ্টি বা ক্ষতিকর বৃষ্টি হলে দোয়া করতেন— اللَّهُمَّ حَوَالَيْنَا، وَلاَ عَلَيْنَا উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা হাওয়ালাইনা ওয়া লা আলাইনা।’ অর্থ: হে আল্লাহ আমাদের আশপাশে (জনবসতির বাইরে) বৃষ্টি দাও, আমাদের ওপর নয়। (বুখারি ৯৩৩)
২. আল্লাহর ভয়ে ভীত হওয়া
হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, তীব্র বাতাস ও ঝড়ের সময় আল্লাহর রাসুল (সা.) ঘাবড়ে যেতেন যে এটি আল্লাহর আজাব কিনা এবং দোয়া করতেন— اللَّهُمَّ إِنِّي أَسأَلك خَيرهَا وَخير مَا فِيهَا وَخير مَا أرْسلت بِهِ وَأَعُوذ بك من شَرها وَشر مَا فِيهَا وَشر مَا أرْسلت بِهِ উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা খাইরাহা ও খাইরা মা ফীহা ওয়া খাইরা মা উরসিলাত বিহি ওয়া আউজুবিকা শাররাহা ওয়া শাররা মা ফীহা ওয়া শাররা মা উরসিলাত বিহি।’ অর্থ: ‘হে আল্লাহ্! আমি আপনার কাছে এর কল্যাণ চাই, এর মধ্যে যে কল্যাণ আছে সেটা চাই এবং যে কল্যাণ দিয়ে এটাকে পাঠানো হয়ে তা চাই এবং আমি আপনার কাছে এর অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাই, এর মধ্যে যে অনিষ্ট অন্তর্ভুক্ত আছে তা থেকে আশ্রয় চাই এবং যে অনিষ্টসহ এটাকে পাঠানো হয়েছে তা থেকে আশ্রয় চাই।’ (মুসলিম ৮৯৯)
৩. বৃষ্টিতে ভেজা
অনেক সময় বৃষ্টি হলে আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বৃষ্টিতে ভিজতেন। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা আল্লাহর রাসুলের (সা.) সঙ্গে ছিলাম, এ সময় বৃষ্টি শুরু হলো। আল্লাহর রাসুল (রা.) তার শরীরের ওপরের অংশ থেকে কাপড় সরিয়ে দিলেন। ফলে তার শরীর ভিজে গেল। আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি কেন এ রকম করলেন? তিনি উত্তরে বললেন— لِأَنَّهُ حَدِيثُ عَهْدٍ بِرَبِّهِ تَعَالَى যেহেতু মহান প্রভুর কাছ থেকে সদ্য আগত (তাই আমি শরীরে লাগিয়ে নিলাম বরকতের জন্য)। (মুসলিম ১৯৫৬)
৪. বৃষ্টিকে আল্লাহর রহমত বলে অভিহিত করা
হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) যখন বৃষ্টি দেখতেন, তখন বলতেন, এ তো আল্লাহর রহমত। (মুসলিম ১৯৫৭)
৫. অতি বৃষ্টি বন্ধে দোয়া পড়া
হজরত আনাস (রা.) বলেন, এক জুমার দিন রাসুলুল্লাহ (সা.) খুতবা দেওয়া অবস্থায় এক সাহাবি মসজিদে প্রবেশ করে আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! জীবজন্তু মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছে, পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে, আল্লাহ তাআলার কাছে আমাদের জন্য বৃষ্টি বন্ধে প্রার্থনা করুন। তখনই রাসুলুল্লাহ (সা.) দুই হাত সম্প্রসারিত করে দোয়া করলেন— اللَّهُمَّ حَوَالَيْنَا وَلاَ عَلَيْنَا، اللَّهُمَّ عَلَى الآكَامِ وَالْجِبَالِ وَالآجَامِ وَالظِّرَابِ وَالأَوْدِيَةِ وَمَنَابِتِ الشَّجَرِ উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা হাওয়ালাইনা ওয়া লা আলাইনা; আল্লাহুম্মা আলাল আকামি ওয়াল ঝিবালি ওয়াল আঝামি ওয়াজ জিরাবি ওয়াল আওদিয়াতি ওয়া মানাবিতিশ শাঝারি।’ অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমাদের আশে পাশে, আমাদের উপর নয়। হে আল্লাহ! টিলা, মালভূমি, উপত্যকায় এবং বনভূমিতে বর্ষণ করুন।’ (বুখারি ৯৩৩; মুসলিম ৮৯৭)
৬. বৃষ্টি দোয়া কবুলের সময়
বৃষ্টির সময় হচ্ছে দোয়া কবুলের সময়গুলোর একটি। তাই এ সময় আল্লাহর দরবারে নিজের চাহিদা অনুযায়ী বেশি বেশি দোয়া করা। বৃষ্টি চলমান সময়ে দোয়া কবুল হয়। তাই এ সময় দোয়ার জন্য লুফে নেয়া সুন্নাত। হজরত সাহল বিন সাদ (রা.) বলেন— ثِنْتَانِ لَا تُرَدَّانِ، أَوْ قَلَّمَا تُرَدَّانِ الدُّعَاءُ عِنْدَ النِّدَاءِ، وَعِنْدَ الْبَأْسِ حِينَ يُلْحِمُ بَعْضُهُمْ بَعْضًا، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: وَوَقْتُ الْمَطَرِ ‘দুই সময়ের দোয়া ফেরত দেয়া হয় না কিংবা (তিনি বলেছেন), খুব কমই ফেরত দেওয়া হয়। আজানের সময়ের দোয়া এবং রণাঙ্গণে শত্রুর মুখোমুখি হওয়ার সময়ের দোয়া, অন্য বর্ণনা মতে, বৃষ্টির সময়ের দোয়া।’ (আবু দাউদ ২৫৪০)
বৃষ্টির সময়ের দোয়া ও আমল আমাদের শেখায়— একজন মুমিন জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেই আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার সুযোগ খোঁজেন। প্রকৃতির প্রতিটি পরিবর্তনের মধ্যেও তিনি আল্লাহর কুদরত ও রহমতের নিদর্শন দেখতে পান। তাই বৃষ্টি নামলে শুধু আবহাওয়ার সৌন্দর্য উপভোগ করাই নয়, বরং নবীজি (সা.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী দোয়া করা, আল্লাহর রহমত কামনা করা এবং তার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়াই একজন মুসলমানের প্রকৃত পরিচয়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে বৃষ্টির সময়ের সুন্নাহসমূহ আমল করার এবং তার রহমত লাভের তৌফিক দান করুন। আমিন।



