আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকর করতে গিয়ে ফিলিপাইনের সিনেট ভবনে নজিরবিহীন এক সংঘাতের সৃষ্টি হয়েছে। বুধবার (১৩ মে) সন্ধ্যায় সাবেক পুলিশ প্রধান ও বর্তমান সিনেটর রোনাল্ড ডেলা রোসাকে গ্রেফতার করতে পুলিশ ও মেরিন সেনারা যখন সিনেট ভবনে প্রবেশ করে, তখন অন্তত ১৫ রাউন্ড গুলির শব্দ শোনা যায়।
গুলিবর্ষণের ঘটনা
প্রত্যক্ষদর্শী ও সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদক জামেলা আলিনদোগান জানান, ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত সেনারা যখন ভবনের সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠছিলেন, তখনই গুলিবর্ষণ শুরু হয়। গুলির শব্দ শোনার পর সেখানে উপস্থিত সংবাদকর্মীরা প্রাণভয়ে দিগ্বিদিক ছুটতে থাকেন। নিরাপত্তা বাহিনী তৎক্ষণাৎ পুরো ভবনটি খালি করার নির্দেশ দেয়। তবে এই গুলি ঠিক কারা চালিয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ডেলা রোসার ভূমিকা
ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতের্তের আমলে ‘মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ বা ‘ড্রাগ ওয়ার’-এর প্রধান সেনাপতি সিনেটর রোনাল্ড ডেলা রোসার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। গত সোমবার (১১ মে) আইসিসি তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। গ্রেফতার এড়াতে তিনি গত কয়েকদিন ধরে সিনেট ভবনের ভেতরেই অবস্থান করছেন।
গ্রেফতারের আশঙ্কায় ডেলা রোসা বুধবার ফেসবুকে একটি ভিডিও বার্তা পোস্ট করেন। সেখানে তিনি ফিলিপাইনবাসীদের প্রতি তাকে রক্ষার জন্য সিনেট ভবনে আসার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “আমি আপনাদের কাছে সাহায্য চাইছি। দয়া করে কোনো ফিলিপাইন নাগরিককে দি হেগ-এ (আইসিসি সদর দপ্তর) নিয়ে যেতে দেবেন না।” অশ্রুসজল চোখে তিনি প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়রকেও অনুরোধ করেন যাতে তাকে আন্তর্জাতিক আদালতের হাতে তুলে না দেওয়া হয়। ডেলা রোসা দাবি করেন, তিনি কোনো দুর্নীতির সাথে জড়িত ছিলেন না এবং দেশের স্বার্থেই কাজ করেছেন।
নিরাপত্তা পরিস্থিতি
সিনেট সার্জেন্ট-অ্যাট-আর্মস মাও আপলাস্কা জানিয়েছেন, ডেলা রোসার বার্তার পর থেকেই আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা ভবনের বাইরে অবস্থান নিতে শুরু করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেখানে মেরিন সেনাদের মোতায়েন করা হয়।
প্রেক্ষাপট
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে রদ্রিগো দুতের্তে ক্ষমতায় আসার পর মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশের হিসেবেই অন্তত ৬,০০০ সন্দেহভাজন মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি এবং এর বেশিরভাগই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। এই অভিযানের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে দুতের্তে এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ডেলা রোসার বিচার এখন আন্তর্জাতিক আদালতের কাঠগড়ায়।
রাজনৈতিক প্রভাব
ফিলিপাইনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই ঘটনা এক বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, দুতের্তের মিত্ররা আন্তর্জাতিক আইন বা আইসিসি-র সার্বভৌমত্বকে স্বীকার করতে নারাজ। বিচারালয়ের পবিত্র আঙিনায় এমন সশস্ত্র সংঘাত ও গুলির লড়াই ফিলিপাইনের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির এক শোচনীয় চিত্রকেই ফুটিয়ে তুলছে।
সূত্র: আল-জাজিরা।



