শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় আতাউর রহমানকে শেষ বিদায়
শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় আতাউর রহমানকে শেষ বিদায়

ফুলেল শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় নাট্যনির্দেশক, অভিনয়শিল্পী ও সংগঠক আতাউর রহমানকে শেষবিদায় জানালেন দীর্ঘদিনের সহকর্মী, শিল্পী, নির্দেশক, সংগঠকসহ সর্বস্তরের মানুষ। রাজধানীর এক হাসপাতালে গতকাল দিবাগত রাতে মারা গেছেন আতাউর রহমান। আজ মঙ্গলবার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে আতাউর রহমানের মরদেহ শহীদ মিনারে নেওয়া হয়।

শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন

হাতে ফুল, চোখে অশ্রু—তিনটার পর থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মানুষের ভিড় দেখা গেছে। মরদেহবাহী কফিন আনার পর মানুষের সারি দীর্ঘ হতে থাকে। বিকেল চারটা পর্যন্ত শ্রদ্ধা নিবেদন করেন আগত ব্যক্তিরা। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে রাজধানীর বনানী কবরস্থানে আতাউর রহমানকে সমাহিত করা হয়।

স্মৃতিচারণা

বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের আয়োজনে শহীদ মিনারে আতাউর রহমানকে নিয়ে রামেন্দু মজুমদার, নাসির উদ্দীন ইউসুফ, লাকী ইনামসহ আরও কয়েকজন স্মৃতিচারণা করেন। রামেন্দু মজুমদার বলেন, ‘নানা কাজের মধ্যে আতাউর স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। প্রচুর নাটক তিনি নির্দেশনা দিয়েছেন। অভিনয়ের চেয়েও নির্দেশনায় আতাউরের দক্ষতা ছিল অনেক বেশি। আপাতদৃষ্টিতে যে নাটক মনে হয় যে দর্শক গ্রহণ করবে না, সেটা আতাউর এমনভাবে পরিবেশন করেছেন, দর্শকের কাছে সেটা সহজবোধ্য হয়েছে।’

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রামেন্দু মজুমদারের ভাষ্য, ‘নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, মামুনুর রশীদ, আমি ও আতাউর একসঙ্গে চলেছি। আমাদের চারজনের বন্ধন ছিন্ন হয়ে গেল। আজকে আতাউর চলে গেল। আমি একটা কথা মনে করি, আতাউর যে ধরনের জীবনযাপন করেছে, তাতে আতাউরের মৃত্যুতে শোক নয়, আমরা ওর জীবনকে উদ্‌যাপন করতে চাই। কারণ, সে সব সময় আনন্দের মধ্যে থাকতে চেয়েছে।’

নাসির উদ্দীন ইউসুফের স্মৃতি

নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু বলেন, ‘আমরা চারজন সব সময় একসঙ্গে কাজ করেছি। আমরা গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন শুরু করেছি চারজনের উদ্যোগে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আতাউর রহমানের কিছু নাটকের কথা আমাদের স্মরণ করতে হবে। আমাদের “গ্যালিলিও”র কথা বলতে হবে। “ওয়েটিং ফর গডো”র কথা বলতে হবে।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

লাকী ইনামের স্মৃতি

সত্তরের দশকে আতাউর রহমানের নির্দেশনায় মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ’ নাটকে কাজ করেছেন লাকী ইনাম। তিনি বলেন, ‘তাঁর নির্দেশনার সেই স্মৃতি, সেই কর্মকাণ্ড সব আমার আজকে ভীষণভাবে মনে পড়ছে। তিনি হাতে ধরে আমাকে মঞ্চে থিয়েটার করা শিখিয়েছিলেন। উনি আমার প্রথম নির্দেশক।’

লাকী ইনাম বলেন, ‘আজকাল আমাদের এই থিয়েটার জগতে, নাট্যজগতে আমাদের লেখাপড়া, আমাদের জ্ঞানের অত্যন্ত সংকট হয়ে গিয়েছে। আমরা পড়াশোনা কম করছি। আতা ভাইয়ের কথা মনে পড়লে এটুকু মনে পড়ে, উনি যখনই মাইক্রোফোন পেতেন, উনি যখন বক্তৃতা দিতেন, ভাষণ দিতেন, তাঁর কথায় কত যে বিখ্যাত নাট্যকার, নির্দেশক, নাট্য গবেষকদের, দার্শনিকদের নানা রেফারেন্স উনি দিতেন, এটা অসাধারণ! আমি সব সময় বলতাম, “আপনি কখন এত লেখাপড়া করেন আতা ভাই? আপনার থেকে আমাদের শেখার শেষ হবে না এ জনমেই।” উনি হাসতেন। বলতেন, “আমার পড়তে ভালো লাগে”।’

মেয়ের আবেগঘন বক্তব্য

আতাউর রহমানের শেষ দিনগুলোতে তাঁর পাশে ছিলেন মেয়ে শর্মিষ্ঠা রহমান। মেয়ে বলেন, ‘শেষ কয়েক মাস তাঁর সাথে কাটানোর সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। সে জন্য আমি ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছি, সে থিয়েটারকে খুব মিস করছিল। গত কয়েক মাস ধরে কাজ করতে পারছিলেন না। সে জন্য আসলে আপনারা আমার থেকে বেটার বুঝবেন, কারণ আপনারা সবাই তার সহকর্মী বন্ধু।’

শর্মিষ্ঠা রহমান বলেন, ‘আমার খুব কষ্ট লাগছে যে সে আসলে দেখতেই পেল না যে কতজন তাকে ভালোবাসে। সে বোধ হয় একটা ভুল ধারণা নিয়ে গেল, মানুষ তাকে ভালোবাসে নাই। এই জায়গাটায় বড় একটা মনঃকষ্ট আমাদের পরিবার থেকে, আমার এবং আমার মায়ের। কারণ, আমরা প্রতিদিন এই কথাটা শুনতাম, কেউ কাছে আসে না, কেউ তাকে ভালোবাসে না। এটা খুবই মনে হচ্ছে। আর যারা তার বন্ধুরা আছেন, সমবয়সী, কাছাকাছি বয়সী, আমার খুব অনুরোধ থাকবে, আমাদের একজন একজনকে খুব প্রয়োজন। আমরা যদি একসাথে না থাকি, হাতে হাত না ধরি, তাহলে আমার বাবার মতো বড় লোনলি হয়ে চলে যেতে হবে।’

শ্রদ্ধা জানাতে আসা বিশিষ্টজনেরা

আতাউর রহমানকে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন মফিদুল হক, তারিক আনাম খান, খায়রুল আনাম শাকিল, খ ম হারুন, সারা যাকের, আশীষ খন্দকার, আজাদ আবুল কালাম, লাইসা আহমেদ লিসা, সামিনা লুৎফাসহ আরও অনেকে।

সংগঠনের মধ্যে শ্রদ্ধা জানিয়েছে ছায়ানট, উদীচী, কণ্ঠশীলন, আব্দুল্লাহ আল-মামুন থিয়েটার স্কুল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় নাট্যকলা বিভাগ, ডিরেক্টর গিল্ডস, অভিনয়শিল্পী সংঘ, ঢাকা থিয়েটার, প্রাচ্যনাট, বটতলাসহ বেশ কয়েকটি সংগঠন।