ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সংঘাতের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের গোপন এক সামরিক অভিযানের খবর সামনে আসায় মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গত ৭ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি ঘোষণার ঠিক আগে আমিরাত ইরানি হামলার প্রতিশোধ নিতে দেশটির লাজান দ্বীপে বড় ধরনের হামলা চালায়। এই ঘটনা উপসাগরীয় দেশগুলোকে সরাসরি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
প্রতিশোধমূলক হামলা ও কূটনৈতিক জটিলতা
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইরান আমিরাতকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে আসছিল। দুবাইয়ের শাসকদের চরম কূটনৈতিক বিরোধিতার কারণে ইরান আমিরাতকে বিশেষভাবে নিশানা করে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল কিছু ছবি প্রকাশ করেছে যেখানে আমিরাতের ব্যবহৃত ফরাসি মিরাজ যুদ্ধবিমান এবং চীনা উইং লং ড্রোনকে ইরানের ভেতরে অভিযানে অংশ নিতে দেখা গেছে।
ট্রাম্পের সতর্কবার্তা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
এদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সোমবার সতর্ক করেছেন যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে জটিলতায় যুদ্ধবিরতি এখন লাইফ সাপোর্টে। যদি যুদ্ধবিরতি ভেঙে যায়, তবে আমিরাত যে ইরানের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হবে, তা এখন স্পষ্ট।
সৌদি আরব ও কাতারের অবস্থান
ইরানের বিরুদ্ধে আমিরাত সামরিক পদক্ষেপ নিলেও সৌদি আরব বা কাতারকে তারা এই পথে টেনে নিতে পারেনি। সৌদি আরবের সাবেক রাষ্ট্রদূত তুর্কি আল-ফয়সাল এক নিবন্ধে আমিরাতের এই নীতির বিপরীতে সৌদির ‘ধৈর্যশীল’ অবস্থানের প্রশংসা করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘ইসরায়েলি পরিকল্পনা যদি আমাদের ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বাধিয়ে দিতে সফল হয়, তবে এই অঞ্চল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে এবং ইসরায়েল একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করবে।’ সৌদি আরবের আশঙ্কা, পুরোদমে যুদ্ধ শুরু হলে তাদের তেলক্ষেত্র, পানি শোধন কেন্দ্র, এমনকি ভিশন ২০৩০ প্রকল্পগুলোও থমকে যাবে এবং হজের ওপর বিপর্যয়কর প্রভাব পড়বে।
কুয়েতে ইরানি নাগরিক গ্রেফতার
অন্যদিকে, কুয়েত জানিয়েছে যে তারা তাদের বৃহত্তম বুবিয়ান দ্বীপে সন্ত্রাসী হামলার চেষ্টাকালে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) চার সদস্যকে গ্রেফতার করেছে। কুয়েত এই ঘটনায় ইরানি রাষ্ট্রদূতকে তলব করে তীব্র ক্ষোভ জানিয়েছে। আমিরাত এক বিবৃতিতে কুয়েতের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে এই ঘটনাকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি ও পুনরুদ্ধার
ইরানি হামলায় আমিরাতের বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে। গত মাসে ইরানের হামলায় আমিরাতের বৃহত্তম গ্যাস প্ল্যান্টটি বন্ধ হয়ে গেছে। মূল মালিক প্রতিষ্ঠান অ্যাডনক গ্যাস মঙ্গলবার জানিয়েছে, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ এর সক্ষমতা ৮০ শতাংশে ফিরতে পারে এবং পূর্ণ সক্ষমতা ফিরে পেতে ২০২৭ সাল পর্যন্ত সময় লাগবে।
নতুন চতুর্দেশীয় জোটের সম্ভাবনা
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকটময় পরিস্থিতিতে একটি নতুন চতুর্দেশীয় জোটের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ পাকিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্ক ও কাতারকে নিয়ে একটি শক্তিশালী জোটের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে উপসাগরীয় উত্তেজনার কারণে যেন গাজা ইস্যু হারিয়ে না যায়। তিনি ইসরায়েলি সম্প্রসারণবাদকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার এক নম্বর চ্যালেঞ্জ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
ওমানের মধ্যস্থতা ও হরমুজ প্রণালি
এদিকে, ইরান ওমান সরকারের সঙ্গে বৈঠক শুরু করেছে। তেহরানের পরিকল্পনা অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওপর তারা বিভিন্ন সেবা বাবদ শুল্ক আরোপের কথা ভাবছে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান।



