সুপ্রিম কোর্ট বার নির্বাচন ঘিরে বিতর্ক, আওয়ামী লীগ সমর্থকরা অংশ নিতে পারছেন না
সুপ্রিম কোর্ট বার নির্বাচন ঘিরে বিতর্ক, আওয়ামী লীগ সমর্থকরা বাদ

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার পতনের পর থেকে আর সুপ্রিম কোর্ট বার (আইনজীবী সমিতি) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। প্রায় দুই বছর পর ২০২৬-২০২৭ সেশনের নির্বাচনের পথ খুললেও দেখা দিয়েছে বিতর্ক। সেই বিতর্কের অংশ হিসেবে কার্যক্রম-নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সমর্থক আইনজীবীদের এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয়নি। ফলে আগামী ১৩ ও ১৪ মে অনুষ্ঠেয় বার নির্বাচনে জয় নিয়ে আশাবাদী বিএনপি সমর্থিত আইনজীবীরা উৎসবে মেতে উঠেছেন। তবে এই নির্বাচনে ভোট না দেওয়ার বিষয়ে সাধারণ আইনজীবীদের নিয়ে জোট বেঁধেছেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবীরা। তবে এখন পর্যন্ত নির্বাচন নিয়ে কোনো অভিযোগ তোলেননি জামায়াত ইসলামী ও এনসিপি সমর্থিত কিংবা দলীয় পরিচয়হীন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।

নির্বাচনের পদ্ধতি ও পদসংখ্যা

বিধি অনুসারে সুপ্রিম কোর্ট বার নির্বাচনে কার্যকরী কমিটির সভাপতি পদে একটি, সহ-সভাপতি পদে দুটি, সম্পাদক পদে একটি, কোষাধ্যক্ষ পদে একটি, সহ-সম্পাদক পদে দুটি এবং কার্যকরী কমিটির সদস্য পদে সাতটি পদসহ সর্বমোট ১৪টি পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত ভোটগ্রহণের জন্য নির্বাচন পরিচালনা উপ-কমিটি দায়িত্ব পালন করে থাকেন।

এবারের প্রার্থী ও ভোটার সংখ্যা

এবারের ২০২৬-২০২৭ সেশনের নির্বাচনে সভাপতি পদে তিন জন, সহ-সভাপতি পদে চার জন, সম্পাদক পদে সাত জন, কোষাধ্যক্ষ পদে দুজন, সহকারী সম্পাদক পদে পাঁচ জন, সদস্য পদে ১৯ জন প্রার্থী হয়েছেন। আর ভোটার রয়েছেন প্রায় ১২ হাজার আইনজীবী।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সাধারণ আইনজীবীদের মতামত

সাধারণ আইনজীবীদের মতে, বিগত সময়গুলোর মধ্যে বিশেষ করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার আমলেও নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়েছে সুপ্রিম কোর্ট বার নির্বাচন। এই নির্বাচনের অধিকাংশ সেশনগুলোতে বিএনপি-জামায়াত জোটের আইনজীবীদের ঐক্যের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল বেশি। আসন্ন নির্বাচনের সভাপতি প্রার্থী ব্যারিস্টার এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন টানা সাতবার সেক্রেটারি ও বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল টানা তিনবার সেক্রেটারি নির্বাচিত হয়েছিলেন। প্রতি বছর নির্বাচনের বিধান সত্ত্বেও ৫ আগস্টের সরকার পতনের পর তলবি সভার নামে অ্যাডহক কমিটি দিয়ে প্রায় দুই বছর বারের দায়িত্ব কুক্ষিগত রাখার ঘটনায় বারবার ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ আইনজীবীরা।

অ্যাডহক কমিটির বক্তব্য

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির বর্তমানে অ্যাডহক কমিটির ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহফুজুর রহমান মিলন জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় দলের সমর্থক আইনজীবীরা সুযোগ পাচ্ছেন না। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আওয়ামী লীগের সব ধরনের কার্যক্রম সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। এ বিষয়ে ২০২৫ সালের সরকারি গেজেট ও ২০২৬ সালের আইন অনুসারে আওয়ামী লীগ সমর্থকরা সুপ্রিম কোর্ট বারের নির্বাচনে অযোগ্য।

বিএনপি নেতার বক্তব্য

বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির আইন বিষয়ক সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল বলেন, সমিতিতে চব্বিশের জুলাইযোদ্ধাসহ অনেকে লিখিত দরখাস্ত দিয়েছেন এবং সংবাদ সম্মেলনও করেছেন। তাদের দাবি ছিল, যারা পূর্বে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ব্যানারে নির্বাচন করেছেন বা সমর্থন জানিয়েছেন, তাদের যেন নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়া হয়। তাদের সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট বারের বিশেষ সাধারণ সভায় কয়েকজনের মনোনয়নপত্র বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

প্রার্থিতা বাতিলের অভিযোগ

আসন্ন নির্বাচনে সম্পাদক প্রার্থী হতে মনোনয়নপত্র তুলেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. মোতাহার হোসেন সাজু। কিন্তু আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততার অভিযোগে তার প্রার্থিতা বাতিল করা হয়। প্রায় ৪২ জন স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিলের বিষয়ে বিএনপি সমর্থিত আইনজীবীরা ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ডে’ কথা বলছেন বলে পাল্টা অভিযোগ তুলেছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. মোতাহার হোসেন সাজু। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট বারের বিধান ও নির্বাচনি বিধি-২০০১-এর কোথাও এটা বলা নেই কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হলে নির্বাচন করতে পারবেন না। তারা ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ডে’ কথা বলছে। একেক সময় একেক কথা বলছে। এখানে কেউ আওয়ামী লীগের পক্ষে নমিনেশন পত্র জমা দেয়নি। তারা (অ্যাডহক কমিটি) একবার বলছে তলবি সভায় উপস্থিত আইনজীবীদের আপত্তির কারণে নমিনেশন দেয়নি। আবার বলছে জুলাইযোদ্ধাদের আবেদনের কারণে আমাদের নির্বাচনে অংশ নিতে দেয়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিগত বছরগুলোতে দেখেছি নির্বাচন সংক্রান্ত আহ্বায়ক কমিটির সিদ্ধান্ত ছাড়া কিছু হয়নি। কিন্তু এবার যা করা হয়েছে তা এই বারের ৭৭ বছরের ইতিহাসে কলঙ্কজনক অধ্যায়। এই প্রহসনের নির্বাচনে আমাদের মতোই সাধারণ আইনজীবীরাও ভোট দিতে যাবে না। সাধারণ আইনজীবীদের সবাই আমাদের ভোট দিতে না যাওয়ার বিষয়ে আশ্বস্ত করেছেন।’

ভোট বর্জনের ঘোষণা

ভোট বর্জনের ঘোষণা দেওয়া সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আসলাম মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘একটা কারণেই ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছি। এবারের নির্বাচনে সাধারণ আইনজীবীদের মধ্যে ৪২ জন অংশ নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাদের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে। অথচ বাতিলের কোনো কারণ জানানো হয়নি। এমনকি মুক্তিযোদ্ধা আইনজীবী পরিষদের প্রার্থীদের প্রার্থিতাও বাদ দেওয়া হয়েছে। তাই আমার মতো অধিকাংশ সাধারণ আইনজীবী এই ভোট বর্জন করেছেন। তারা এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক পোস্ট করেছেন। আমরা আমাদের কষ্টার্জিত টাকায় বারের এই প্রহসনের নির্বাচন চাই না। আমরা এর নিন্দা জানাচ্ছি।’

নির্বাচন সাব-কমিটির বক্তব্য

তবে ৪২ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিলের বিষয়ে কিছুই জানা নেই বলে দাবি করেছেন নির্বাচন সাব-কমিটির প্রধান আইনজীবী ও অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মিফতাহ্ উদ্দিন চৌধুরী।