১৯২২ সালের ১৮ মে প্যারিসের অভিজাত হোটেল ম্যাজেস্টিকে ব্রিটিশ শিল্পপৃষ্ঠপোষক সিডনি ও ভায়োলেট শিফ এক নৈশভোজের আয়োজন করেছিলেন। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জীবিত শিল্পীদের এক টেবিলে বসানো। সত্যিই তাই হলো; এক টেবিলে বসলেন মার্সেল প্রুস্ত, জেমস জয়েস, পাবলো পিকাসো ও ইগর স্ট্রাভিনস্কি।
শিফ দম্পতির আশা বনাম বাস্তবতা
শিফ দম্পতি হয়তো ভেবেছিলেন, এই সন্ধ্যা থেকে জন্ম নেবে যুগান্তকারী বন্ধুত্ব, শিল্পবিষয়ক উত্তেজনাপূর্ণ আলোচনা কিংবা কোনো নান্দনিক বিস্ময়। কিন্তু বাস্তবে ঘটে পুরো উল্টো ঘটনা। সাহিত্যের ইতিহাসের সবচেয়ে অস্বস্তিকর সাক্ষাৎ যেন এটি।
অস্বস্তিকর সাক্ষাতের বিবরণ
বিভিন্ন লেখকের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, রাতের খাবার শেষ হওয়ার পর বেশ নেশাগ্রস্ত অবস্থায় এসে হাজির হন জেমস জয়েস। তার পোশাক ছিল এলোমেলো। এসেই প্রথমে পা বাড়ান শ্যাম্পেনের দিকে। অন্যদিকে, অসুস্থ ও ক্লান্তি নিয়ে দামী পশমী পোশাকে রাত দুটোর পর এসে পৌঁছান মার্সেল প্রুস্ত। এরপরের ঘটনাগুলো নিয়ে বিবরণ ভিন্ন ভিন্ন হলেও, একটি বিষয়ে সবাই একমত যে সাক্ষাৎটি মোটেও সুখকর হয়নি।
পরে জয়েস তার বন্ধু জ্যাক মেরকান্তোঁকে বলেছিলেন, “প্রুস্ত কেবল ডাচেসদের নিয়েই কথা বলছিলেন, আর আমি বরং তাদের গৃহপরিচারিকাদের নিয়ে বেশি আগ্রহী ছিলাম।”
জয়েসের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ফ্রাঙ্ক বাজেনকে দেওয়া আরেক বর্ণনায় ঘটনাটি আরও কৌতুকপূর্ণ হয়ে ওঠে। জয়েস বলেন, “আমাদের পুরো কথোপকথন জুড়ে ছিল শুধু ‘না’ শব্দটি। প্রুস্ত আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি অমুক ডিউককে চিনি কিনা। আমি বললাম, ‘না’। তারপর গৃহকর্ত্রী প্রুস্তকে জিজ্ঞেস করলেন, তিনি Ulysses-এর কোনো অংশ পড়েছেন কিনা। প্রুস্ত বললেন, ‘না’। এভাবেই চলছিল।”
কবি ও লেখকদের বর্ণনা
আমেরিকান কবি উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামসের বর্ণনায় সন্ধ্যাটিকে প্রায় অসুস্থ প্রতিযোগিতামূলক মনে হয়:
- জয়েস: “প্রতিদিনই মাথাব্যথা হচ্ছে। চোখের অবস্থাও খুব খারাপ।”
- প্রুস্ত: “আমার পেটের যা অবস্থা! মনে হচ্ছে এখনই চলে যেতে হবে।”
- জয়েস: “আমারও একই সমস্যা। কেউ যদি হাত ধরে নিয়ে যেত!”
অন্যদিকে লেখক ফোর্ড ম্যাডক্স ফোর্ডের স্মৃতিতে দৃশ্যটি যেন নিখাদ ব্যঙ্গরস। প্রুস্ত তার Du côté de chez Swann-এর প্রসঙ্গ তুলতেই জয়েস নির্লিপ্তভাবে বলেন, “না, পড়িনি।” এরপর জয়েস যখন Ulysses-এর কথা তোলেন, প্রুস্তও একই উত্তর দেন: “না, পড়িনি।”
পরিণতি
এই অস্বস্তিকর অথচ কিংবদন্তিতুল্য সাক্ষাতের মাত্র ৬ মাস পর, ১৯২২ সালের ১৮ নভেম্বর মারা যান মার্সেল প্রুস্ত। যদিও প্রুস্তের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় উপস্থিত ছিলেন জেমস জয়েস। জয়েস ও প্রুস্তের মুখোমুখি হওয়া আমাদের বিশেষভাবে মনে করিয়ে দেয় যে, মহান শিল্পীরাও সবসময় মহান আলাপচারী হন না।



