ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সিনেমা প্রদর্শনী বন্ধ: উগ্রবাদী গোষ্ঠীর কাছে সরকারের আত্মসমর্পণ?
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সিনেমা বন্ধ: উগ্রবাদী গোষ্ঠীর কাছে সরকারের আত্মসমর্পণ?

চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশে মৌলবাদী ও ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে। তারা অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে নানা অপতৎপরতা চালায়: মাজারে হামলা, কবর থেকে লাশ তুলে পোড়ানো, ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা, বাউলদের ওপর আক্রমণ, নারীদের খেলা বন্ধ ও পোশাকের জন্য হেনস্থা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ, ছায়ানট ও উদীচীতে হামলা, শীর্ষ সংবাদপত্রের অফিসে আগুন, এবং শরিয়া আইন চালুর দাবি। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে এসব বন্ধ হবে বলে জনমনে প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনা সেই প্রত্যাশায় ধাক্কা দিয়েছে।

সরকার অনুমোদিত সিনেমা বন্ধ

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ছাড়পত্র পাওয়া 'বনলতা এক্সপ্রেস' সিনেমার প্রদর্শনী ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কওমি মাদ্রাসার কিছু শিক্ষার্থীর বাধায় বন্ধ করা হয়। অথচ সিনেমাটি ঢাকাসহ দেশের অন্য স্থানে চলছে। সিনেমাটির বিরুদ্ধে অশ্লীলতা বা ধর্মীয় অবমাননার কোনো অভিযোগ নেই। ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রশাসন একটি গোষ্ঠীর বাধা বা মব সৃষ্টির হুমকিতে সিনেমা বন্ধ করে কী বার্তা দিল? তারা কি বলতে চায় যে রাষ্ট্র অনুমোদিত সিনেমাও একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর বাধায় বন্ধ হতে পারে? এই গোষ্ঠীর কাছে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অসহায়? সরকারও এই গোষ্ঠীকে ভয় পায়? অন্তর্বর্তী সরকারের মতো নির্বাচিত সরকারের ওপরেও তাদের প্রভাব আছে?

প্রশাসনের দুর্বলতা

একটি স্কুল মিলনায়তনে সামান্য সিনেমা প্রদর্শনী নিশ্চিত করার ক্ষমতা জেলা প্রশাসনের ছিল না? আজ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যা ঘটল, আগামীকাল অন্য জেলায়ও যদি ধর্মীয় গোষ্ঠী বাধা দেয়, তাহলে সরকার কি একই নির্লিপ্ত ভূমিকা পালন করবে? তাহলে অনির্বাচিত দুর্বল সরকার আর দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ নির্বাচিত সরকারের পার্থক্য কোথায়? নাকি ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর চিন্তার সঙ্গে বর্তমান সরকারের চিন্তার কোনো পার্থক্য নেই?

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

১৩ দফা আন্দোলন

এই গোষ্ঠী ২০১৩ সালে ১৩ দফা বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলন করেছিল, যার মধ্যে ব্লাসফেমি আইনের মতো পশ্চাৎপদ ও সংবিধান-সাংঘর্ষিক দাবি ছিল। ছোটখাটো ঘটনায় সরকার অসহায়তা প্রকাশ করলে, এই গোষ্ঠী সব দাবি নিয়ে রাজপথে নামবে। সরকারকে হয় দাবি মেনে নিতে হবে, নয়তো অ্যাকশনে যেতে হবে। কিন্তু অ্যাকশনের পরিণতি সব সময় ভালো হয় না। তাই শুরু থেকেই সব ধরনের উগ্রবাদ, মৌলবাদ ও কট্টরপন্থার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়া জরুরি। দেশটি কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নয়; এটি সব ধর্ম, শিক্ষা, চিন্তা ও সংস্কৃতির মানুষের দেশ।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বৈচিত্র্য

ব্রাহ্মণবাড়িয়া বৈচিত্র্যময় জেলা। এখানে জন্মেছেন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, অদ্বৈত মল্লবর্মণ, আল মাহমুদের মতো মানুষ; আবার অগণিত সুফি-সাধক, পীর-মাশায়েখ ও ইসলামি চিন্তাবিদ। এখানে ইসলামি জলসা যেমন হবে, তেমনি গান, সিনেমা, মঞ্চ নাটকও হবে। কিন্তু একটি গোষ্ঠী বলছে এখানে সিনেমা চলবে না, কারণ এটি আলেম-ওলামার শহর। এই যুক্তিতে সিলেটেও সব সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ হতে পারে। পরে চট্টগ্রামে, তারপর সারা দেশে। সরকার কি সেই বাস্তবতা মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত?

প্রতিবাদ ও প্রতিক্রিয়া

সোমবার কসবা উপজেলায় মানববন্ধনে স্থানীয় সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা অভিযোগ করেন, যারা বাংলাদেশকে পেছনের দিকে নিতে চায়, তারাই সিনেমা বন্ধ করেছে। পরে তার বিরুদ্ধে ইসলাম অবমাননার অভিযোগ আনে কওমি ঐক্য পরিষদ। রুমিন ফারহানা স্বতন্ত্র এমপি; তিনি বিএনপির টিকিট না পেয়ে স্বতন্ত্র হয়ে জয়ী হয়েছেন। তার সৎ সাহসের জন্য তাকে ধন্যবাদ। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ যদি ঘোষণা দিতেন যে রাষ্ট্র অনুমোদিত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধা দেওয়ার এখতিয়ার কারও নেই, তাহলে ভালো হতো। তিনি চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে হুঁশিয়ার করেছেন, কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রাষ্ট্রের ভেতরে আরেক রাষ্ট্র তৈরি হচ্ছে, সেটি কি সরকার খেয়াল করছে না?