প্রতিটি জাতির ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ রহিয়াছেন, যাহাদের জীবন বহুলাংশে সেই জাতির বিবেকেরই ইতিহাস। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের একজন। তিনি কেবল সাংবাদিক বা সম্পাদক ছিলেন না-তিনি ছিলেন রাষ্ট্রচিন্তক, জননেতাসুলভ এক দূরদর্শী মানুষ এবং সর্বোপরি সত্যের পক্ষের এক আপসহীন যোদ্ধা। আজ, পহেলা জুন, তাহার মৃত্যুবার্ষিকীতে তাহাকে স্মরণ করা মানে এমন এক আদর্শকে স্মরণ করা, যাহা বাঙালির রাজনৈতিক চেতনা, আত্মমর্যাদাবোধ এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে জাগ্রত করিয়াছিল।
মানিক মিয়ার সাংবাদিকতা ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
ইহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না যে, মানিক মিয়ার সময়কালের সাংবাদিকতা এবং বর্তমান সময়ের সাংবাদিকতা এক নহে। তিনি এমন এক যুগে কলম ধরিয়াছিলেন, যখন সত্য উচ্চারণের মূল্য ছিল কারাবরণ, পত্রিকা বন্ধ, প্রেস বাজেয়াপ্ত হওয়া কিংবা ব্যক্তিগত বিপর্যয়। তখন সংবাদপত্রের অস্তিত্বের প্রশ্ন জড়িত ছিল একটি জাতির অস্তিত্বের প্রশ্নের সহিত। সাংবাদিকতা ছিল কেবল পেশা নহে; ছিল সংগ্রাম, ছিল প্রতিরোধ, ছিল একটি ঐতিহাসিক দায়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়িয়া বারবার নির্যাতিত হইয়াও তিনি কলম নামাইয়া রাখেন নাই। কারণ তিনি উপলব্ধি করিয়াছিলেন, সংবাদপত্র কেবল সংবাদ পরিবেশনের যন্ত্র নহে-ইহা একটি জাতির আত্মপরিচয়ের আয়না।
আজ আমরা প্রযুক্তির বিস্ময়কর যুগে বাস করিতেছি। সংবাদ এখন সেকেন্ডের মধ্যে পৃথিবীর এক প্রান্ত হইতে অন্য প্রান্তে পৌঁছাইয়া যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফরম তথ্যপ্রবাহের চরিত্র আমূল পরিবর্তন করিয়া দিয়াছে। কিন্তু তথ্যের এই প্রাচুর্যের মধ্যেও সত্যের সংকট ক্রমেই প্রকট হইতেছে। মানিক মিয়ার যুগে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ছিল রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মুখে বিপন্ন। আজ সংবাদপত্রের স্বাধীনতা অনেক ক্ষেত্রেই বিভিন্ন চাপ, প্রভাব ও সংকটের মুখে বিপন্ন। এই বাস্তবতা কোনো অংশে কম উদ্বেগজনক নহে।
মানিক মিয়ার আদর্শের প্রাসঙ্গিকতা
এইখানেই মানিক মিয়া পুনরায় প্রাসঙ্গিক হইয়া উঠেন। তিনি বিশ্বাস করিতেন, সংবাদপত্রের শক্তি তাহার ছাপাখানায় নহে, তাহার নৈতিক সাহসে। সংবাদপত্র যদি মানুষের দুঃখ-দুর্দশা, আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং অধিকারবোধের ভাষা না হয়, তাহা হইলে তাহার অস্তিত্বের কোনো তাৎপর্য থাকে না। তিনি সরকারি সুযোগ-সুবিধার প্রলোভনে নত হন নাই, ব্যক্তিগত উন্নতির জন্য নীতির সহিত আপস করেন নাই। তাহার জীবনের অন্যতম শিক্ষা এই যে, সত্যের প্রতি আনুগত্য কোনো পেশাগত দক্ষতার বিষয় নহে-ইহা চরিত্রের বিষয়।
বস্তুত সংবাদপত্রের ইতিহাসে মানিক মিয়া একটি গভীর দার্শনিক প্রশ্ন উত্থাপন করিয়া গিয়াছেন। সংবাদপত্রের দায়িত্ব কি কেবল নিরপেক্ষ থাকা, নাকি অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করা? তাহার জীবন ও কর্মের দিকে তাকাইলে দেখা যায়, তিনি তথ্যের সততা অক্ষুণ্ণ রাখিয়াও নিপীড়িত মানুষের পক্ষে দাঁড়াইয়াছেন।
ইত্তেফাকের ছয় দশকের পথচলা
মানিক মিয়ার অবর্তমানে দৈনিক ইত্তেফাক প্রায় ছয় দশক ধরিয়া বাংলাদেশের সাংবাদিকতার আকাশে এক গুরুত্বপূর্ণ আলোকবর্তিকা হইয়া রহিয়াছে। ইহা সম্ভব হইয়াছে মূলত তাহার নির্মিত ভিত্তির উপর দাঁড়াইয়া। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখিয়াছিলেন, 'তোমার পতাকা যারে দাও, তারে দাও বহিবার শক্তি।' মানিক মিয়া আমাদের হাতে 'ইত্তেফাক' নামের এক অমূল্য পতাকা তুলিয়া দিয়াছিলেন। সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতা, জনগণের পক্ষে অবিচল থাকা এবং ক্ষমতার মুখোমুখি দাঁড়াইবার সাহস-এই পতাকার প্রকৃত শক্তি। প্রায় ছয় দশক ধরিয়া সেই পতাকা বহন করিয়া চলিয়াছে ইত্তেফাক। এই শক্তি কোনো ব্যক্তি, কোনো প্রযুক্তি কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানের একক শক্তি নহে-ইহা মানিক মিয়ার আদর্শের শক্তি।
তবে আত্মসমালোচনারও অবকাশ রহিয়াছে। সময়ের পরিবর্তনের সহিত সংবাদপত্রও নানা সীমাবদ্ধতা, চাপ এবং সংকটের সম্মুখীন হইয়াছে। এই কারণেই মানিক মিয়ার উদ্দেশ্যে যেন বলিতে হয়-আমাদের ক্ষমা করিয়ো তোমার উচ্চতা অনতিক্রম্য, তোমার সাহস সর্বদা ধারণ করা অসম্ভব। আমরা সর্বদা তাহা ধারণ করিতে পারি নাই। তবে ইহা বলাও অত্যুক্তি হইবে না যে, ৭৩ বৎসর ধরিয়া একটি দৈনিক পত্রিকা হলুদের ছাপ এড়াইয়া কেবল 'সংবাদপত্র' হইয়াই টিকিয়া রহিয়াছে-ইহাও কম বিস্ময়কর নহে। ইহাই মাণিক্য আদর্শ। আমরা তাহার রুহের মাগফেরাত কামনা করি।



